প্রখ্যাত বাউলশিল্পী ও যন্ত্রসংগীত সাধক সুনীল কর্মকার আর নেই। শুক্রবার ভোরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। শিল্পী সুনীল কর্মকারের প্রয়াণে বাউল সমাজে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জনপ্রিয় বাউল শিল্পী মুক্তা সরকার সামাজিক মাধ্যমে শোক প্রকাশ করে লেখেন, ‘আহা সুনীল কাকা! কণ্ঠ শুনলেই বোঝতেন আমি আসছি। ‘মা’ বলে ডাকতেন। পালাগানের মঞ্চে কত স্মৃতি… ওপারে ভালো থাকবেন শ্রদ্ধেয় গুণীশিল্পী।’
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। বড় ছেলে প্রসেনজিৎ কর্মকার একজন রাজস্ব কর্মকর্তা এবং ছোট ছেলে বিশ্বজিৎ কর্মকার বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে কর্মরত।
প্রসেনজিৎ কর্মকার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘স্পাইনাল কর্ডের সমস্যা, রক্তে ইনফেকশন, ডায়াবেটিস ও বার্ধক্যজনিত জটিলতায় গত চারদিন আগে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। শুক্রবার ভোর ছয়টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।’ দুপুর আড়াইটায় তার মরদেহ ময়মনসিংহ নগরীর শহীদ মিনার চত্বরে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। ইচ্ছা অনুযায়ী ময়মনসিংহের কলতাপাড়ায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
সুনীল কর্মকার ১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানার বার্ণাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান, কিন্তু চোখের আলো নিভলেও হৃদয়ের আলোয় জয় করেছিলেন সুরের বিশ্বে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের আশ্রয় শিবিরে তিনি বাবা ও ছোট ভাইকে হারান।
ভক্তরা জানান, মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই সংগীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। কিংবদন্তি গীতিকবি জালাল উদ্দিন খাঁর গানের আসরে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। পরবর্তী সময়ে তিনি বাউল গায়ক ইস্রাইল মিয়ার কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। গুরু তাকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন ও তালিম দিয়েছেন।
সুনীল কর্মকার কেবল কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না, বরং এক বহুমুখী যন্ত্রশিল্পীও ছিলেন। তিনি একতারা, দোতারা, স্বরাজ, হারমোনিয়াম, খমক, খুঞ্জুরী, ঢোল ও ঢোলক বাজাতে সমভাবে পারদর্শী ছিলেন। এছাড়া লক্ষ্ণৌ ঘরানার মীর হোসেনের কাছে বেহালা এবং প্রতিবেশী গোবিন্দ কর্মকারের কাছে তবলার তালিম নিয়েছেন।
ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইমতিয়াজ আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জালাল উদ্দিন খাঁর অসংখ্য গানে সুরারোপের পাশাপাশি সুনীল কর্মকার নিজে প্রায় ১৫০–২০০টি গান রচনা করেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারত ও আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি বাংলা লোকগানকে তুলে ধরেছেন। লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক লাভ করেছেন।’
সুনীল কর্মকারের প্রয়াণে বাউল ও লোকসংগীতের জগতে এক অনন্য সূচনার শেষ হয়ে গেল, যা কখনও পূরণ হবার নয়।
এসএসকে/

