দ্য মামার্সের মঞ্চে মাইম নিয়ে স্মৃতিকাতর কামাল-শুভাশীষ
বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:২২
ছবি: সংগৃহীত
চারদিনব্যাপী মূকাভিনয় কর্মশালা এবং চতুর্থ দিনে সনদ বিতরণের পর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী ‘মেক সাম সাইলেন্স’ নিয়ে মঞ্চে দর্শকের সামনে হাজির হলো দ্য মামার্স।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাতটায় সেগুনবাগিচার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে হয়েছিল এই সনদ বিতরণ এবং মূকাভিনয় প্রদর্শনী।
এই আয়োজনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ও ঢাকা থিয়েটারের নাট্যকর্মী শুভাশীষ ভৌমিক এবং সেন্টার ফর তাজউদ্দীন আহমদ রিসার্চ ও অ্যাক্টিভিজম (সিতারা) সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কামরুল ইসলাম আফতাব।
শুরুতেই কর্মশালায় অংশ নেওয়া প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সনদ তুলে দেন কামাল বায়েজীদ এবং কামরুল ইসলাম আফতাব।
কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন মূকাভিনয়শিল্পী এবং দ্য মামার্স দলের প্রধান শহিদুল মুরাদ। তিনি বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের প্রশিক্ষক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ভারতের ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
দ্য মামার্স দল আয়োজিত এই মূকাভিনয় কর্মশালা শুরু হয় গত ১৫ এপ্রিল। শিল্পকলা একাডেমির মহড়া কক্ষে প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলে বলে জানিয়েছে দ্য মামার্স।
মূকাভিনয় দল দ্য মামার্সের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘শব্দহীন এক জগৎ, যেখানে কথা বলে চোখ, মুখ আর শরীরের ভঙ্গিমা। সেই নীরব শিল্পকেই নতুন করে ছড়িয়ে দিতে এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও সহজ ও জনপ্রিয় করে তুলতেই এমন আয়োজন। এই কর্মশালা শুধু অভিনয় শেখার একটি সুযোগ নয়; বরং এটি আত্মপ্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।’
শুভেচ্ছা বক্তব্যে নাট্যজন কামাল বায়েজীদ বলেন, ‘মাইম তো এমনিই অনেক পিছিয়ে আছে। পপুলারিটি নাই, পৃষ্ঠপোষকতা তো নাই -ই। বিজ্ঞাপন নেই। শিল্পীরা আসে না।’
‘আমাকে যখন বলা হল, আমি আগ্রহ সহকারে আসলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করেছি যে এরা ভালো, ভিন্নধর্মীভাবে, মাইমকে ট্রেডিশনের বাইরে সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করবে। বাচ্চাদেরকে নিয়ে কাজ করছে এটি অনেক বড় প্রাপ্তি।’
কর্মশালার সনদ বিতরণ শেষে স্টুডিও থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হয় ’মেক সাম সাইলেন্স’। এবার ’মেক সাম সাইলেন্স’ প্রদর্শনীতে ছিল পাঁচটি দর্শকনন্দিত নকশা মূকাভিনয়।
এর মধ্যে ‘ছাই’ প্রযোজনায় ফুটে উঠেছে বাংলার দিনমজুর মানুষের কঠোর পরিশ্রম, তাদের কষ্ট, নিপীড়ন এবং সেই নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা। নগর জীবনের পরিচিত অথচ ঘটনাবহুল একটি দিনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘অ্যান আনপ্রেডিকটেবল ডে’, যেখানে ট্রাফিক পুলিশের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা মূকাভিনয়ের ভাষায় উপস্থাপিত হয়।
‘ক্রিকেট’ মূকাভিনয়টি নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের ক্রিকেট উন্মাদনা ও জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে, যা উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে।
এ ছাড়া ‘অতন্দ্র প্রহরী’ প্রযোজনায় সীমান্তরক্ষীদের ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার গল্প তুলে ধরা হয়; যা উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের প্রতি। প্রদর্শনীর শেষ প্রযোজনা ছিল ‘রক্ত পিপাসু’। গণহত্যা-বিরোধী এই মূকাভিনয় নকশায় বিশ্বের সকল যুদ্ধ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয়।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২২ প্রাপ্ত শুভাশিষ ভৌমিক নিজেও একজন মূকাভিনয় শিল্পী।
মঞ্চে দ্য মামার্সের প্রদর্শনী নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই পাঁচটা গল্পের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হলো ক্রিকেট। মাইম বলতে যা বোঝায় সেটার অ্যাকচুয়াল রিপ্রেন্টেশন ক্রিকেটে হয়েছে।’
‘তো আমি যেটা বলব যে দ্য মামার্সের যে যাত্রা এটার সাথে আমাদের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করার একটা আন্তর্জাতিক আবহ তৈরি হয়েছে; এটা প্রথম থেকেই। মুরাদের কাজের ভেতরে সেই জিনিসগুলো আছে, যেটা মাইমকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করার মতো।’
এসময় শুভাশিষ ভৌমিকের অভিনয় জীবনের বিশেষ দিক তুলে ধরে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন মঞ্চে উপস্থিত ঢাকা থিয়েটারের জ্যেষ্ঠ সদস্য কামাল বায়েজীদ ।
দর্শকের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘শুভাশিষ আশির দশক থেকে মাইম করে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে অনেক বড় মাইম শিল্পী ছিলেন, কিন্তু উনি সুযোগ থাকা সত্তেও মাইমের প্রশিক্ষণটা নেননি বিভিন্ন কারণে।’
১৯৭৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই থিয়েটারে জড়িয়ে আছেন শুভাশিষ ভৌমিক। ১৯৮৩ সালে তিনি যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে।
শুভাশিষ ভৌমিক বলেন, ‘আমাদের এখানে এই মূকাভিনয় জিনিসটাই খুব অবহেলিত পর্যায়ে আছে, কিন্তু প্রচুর দল। ৫০, ৬০, ৭০ এবং গোটা দেশে খুঁজলে একশর উপরে দল হবে, সংগঠন আছে। কিন্তু মাইম নিয়ে যে কাজটা হয় ...আর আমিও এই কথা বলছি কেন! আমি নিজেও তো ওভাবে কাজ করতে পারি না ‘
‘আমি যেটা করি, সেটা হচ্ছে যে এদের সঙ্গে আছি। বিভিন্ন সময়ে দেখি, পরামর্শ দেই। নিজের ভেতরে চর্চাটা করি। আর আমার দল ঢাকা থিয়েটারে যতটুকু সম্ভব প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। অভিনয়ের ক্ষেত্রে মাইমের অনেক বড় ভূমিকা আছে।’
অনুষ্ঠানে কামাল বায়েজীদ এবং শুভাশিষ ভৌমিকের হাতে দ্য মামার্সের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন শহিদুল মুরাদ।
মঞ্চে ‘মেক সাম সাইলেন্স’ পরিবেশন করেন মূকাভিনয়শিল্পী শহিদুল মুরাদ, শাহাদাত সাব্বির, তাসমিন তৃণা, রিমি শেখ, মো. মারুফ, গোলাম সারওয়ার সবুজ, টিটু এবং হাবিব। আবহ সংগীততে ছিলেন নাজমুল, আলোক পরিকল্পনায় মনির হোসেন এবং প্রজেক্টর সঞ্চালনায় আইরিন সুলতানা।
এর আগে গত ২৩ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের আলী আহম্মদ চুনকা পাঠাগার ও নগর মিলনায়তনে ‘মেইক সাম সাইলেন্স’ প্রদর্শনী করেছিল দ্য মামার্স।
‘যেখানে নীরবতা কথা বলে’ স্লোগানে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা মূকাভিনয় সংগঠন দ্য মামার্স। এবার তারা সপ্তম বছর উদযাপন করেছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

