সাহিত্য থেকে রুপালি পর্দার অনন্য ইতিহাস আমজাদ হোসেন
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২১:০৩
“মা, ভাত দে, ভাত দে মা...”—আঁচলে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছেন মা, আর খিদের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে ছোট মেয়ে জরি। সন্তানের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে না পেরে প্রতিবেশীর রান্নাঘর থেকে ভাত চুরি করতে বাধ্য হন মা; ধরা পড়ে সহ্য করেন অপমান আর প্রহার। ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের শুরুর এই অবিশ্বাস্য করুণ দৃশ্যটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আজও অমলিন।
কেবল ‘ভাত দে’ নয়, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমনি’ কিংবা ‘সুন্দরী’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে
সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম ও মাটির গন্ধকে রূপালি পর্দায় সেলুলয়েডের ফ্রেমে
অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যিনি—তিনি কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার, সাহিত্যিক, অভিনেতা
ও গীতিকার আমজাদ হোসেন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বাংলা চলচ্চিত্রের
এই কালজয়ী রূপকারের জন্মবার্ষিকী। ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জামালপুর শহরের ইকবালপুরে এক
সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মৌলভী নুর উদ্দিন সরকার এবং মাতা কারিমাত্তুন
নেসার কোল আলো করে আসা এই শিশুটিই পরবর্তীতে নিজের বহুমুখী প্রতিভা দিয়ে বাংলাদেশের
শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নিয়েছিলেন। আমজাদ হোসেনের
সৃষ্টির জগতে যাত্রা শুরু হয়েছিল লেখালেখির মধ্য দিয়ে। শৈশব থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি
তার ছিল গভীর অনুরাগ।
মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তৎকালীন
জনপ্রিয় ‘আজাদ’ পত্রিকার
শিশুদের পাতায় তার লেখা প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। কলেজে পড়ার সময় দেশের বিখ্যাত ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি কবিতা পাঠালে, তা প্রকাশের
আগেই সম্পাদকের পক্ষ থেকে প্রশংসাসূচক চিঠি পেয়েছিলেন তরুণের আমজাদ হোসেন। ঢাকায় পাড়ি
জমিয়ে তিনি পুরোপুরি যুক্ত হন সাহিত্য ও নাট্যচর্চায়। লেখালেখির পাশাপাশি মঞ্চ ও ক্যামেরার
নেপথ্য নাটকে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে থাকেন।
চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬১ সালে
মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে। একই বছর তিনি অভিনয় করেন মুস্তাফিজ
পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে।
পরবর্তীতে চলচ্চিত্র প্রসংগে নিজের মেধা সানিত করতে প্রখ্যাত নির্মাতা জহির রায়হানের
সহকারী পরিচালক হিসেবে যুক্ত হন। জহির রায়হানের কালজয়ী ও রাজনৈতিক গণজোয়ার সৃষ্টিকারী
চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’
(১৯৭০)-র কাহিনি ও অবিস্মরণীয় সংলাপ রচয়িতা ছিলেন আমজাদ হোসেন। শুধু নেপথ্যে নয়, ছবিটিতে
বিপ্লবী চরিত্র ‘মধু’র ভূমিকায় অভিনয় করে দারুণ সমাদৃত হন তিনি।
এ ছাড়া জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ও ‘আনোয়ারা’ ছবির সংলাপ রচনার পাশাপাশি অভিনয়ও
করেছিলেন। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘সুজন সখী’র কালজয়ী সংলাপও এসেছিল তাঁরই লেখনী থেকে। নিজ রচিত ‘ধারাপাত’ নাটকের ওপর ভিত্তি করে সালাউদ্দিন
পরিচালিত চলচ্চিত্রে তিনি নায়কের রূপদান করেন। নব্বইয়ের দশকে ঈদুল ফিতরের অন্যতম বিনোদন
টিভি ধারাবাহিক ‘জব্বর আলী’র নামভূমিকায় অভিনয় করে ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আমজাদ হোসেন।
১৯৬৭ সালে নুরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে যৌথভাবে
‘আগুন নিয়ে খেলা’
পরিচালনা করলেও একক পরিচালক হিসেবে আমজাদ হোসেনের আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘জুলেখা’ সিনেমার মাধ্যমে। এরপর আর তাঁকে
পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭৮ সালে নিজের লেখা ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’ উপন্যাস অবলম্বনে
নির্মাণ করেন মাস্টারপিস চলচ্চিত্র ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’।
ববিতা, ফারুক, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন
ও এ টি এম শামসুজ্জামান অভিনীত এই ছবিটি সে বছর রেকর্ডসংখ্যক ১১টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র
পুরস্কার লাভ করে, যার মধ্যে নির্দেশক নিজে একাই পান ৫টি ব্যক্তিগত পুরস্কার। পরবর্তীতে
‘নয়নমনি’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘ভাত দে’ এবং ‘হীরামতি’র মতো একের পর এক সুপারহিট ও কালজয়ী
সিনেমা জাতিকে উপহার দেন তিনি।
বিশেষ করে ‘ভাত দে’ ছবিটি ৯টি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র
পুরস্কার অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়। আমজাদ হোসেনই প্রথম ব্যক্তিত্ব,
যিনি ৬টি ভিন্ন বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতার অনন্য ইতিহাস গড়েছিলেন। সব মিলিয়ে
তিনি সর্বমোট ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ৬টি বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন।
আমজাদ হোসেন কেবল চলচ্চিত্র নির্মাণই করেননি,
বরং লোকজ গানকে ভেঙে আধুনিক সুর ও বাণীর মেলবন্ধনে সংগীত জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিলেন।
গীতিকার হিসেবেও তিনি ছিলেন অসম্ভব সফল। তাঁর লেখা ও সুর করা কালজয়ী গানগুলো আজ অবধি
বাঙালি শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়।
শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য
অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯৩ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা
‘একুশে পদক’ এবং
পরবর্তীতে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করে। সাহিত্যক্ষেত্রে
অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং দুবার অগ্রণী শিশুসাহিত্য পুরস্কার
অর্জন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে দুই পুত্র সাজ্জাদ হোসেন
দোদুল ও সোহেল আরমানের জনক আমজাদ হোসেন; যারা বর্তমানে বাবার রেখে যাওয়া পথ ধরে বিনোদন
অঙ্গনেই সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রূপালি পর্দায় মাটির
মানুষের সুখ-দুঃখের রূপকার এই কিংবদন্তি ২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৭৬ বছর বয়সে ব্যাংককের
একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জন্মদিনে তার কালজয়ী সৃষ্টিকর্মগুলোকে
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে পুরো দেশ ও কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমী। আমজাদ হোসেন চলে গেছেন, কিন্তু
‘জরি’ কিংবা ‘গোলাপী’দের বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে তিনি
চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

