যুক্তরাষ্ট্রে দুই শিক্ষার্থী হত্যা: বৃষ্টির মরদেহের খোঁজ চলছে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ২১:২৪
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ আরেক শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিও বেঁচে নেই। তবে বৃষ্টির (২৭) মরদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার মরদেহ খুঁজে পেতে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
এনবিসি নিউজ ও স্থানীয় ফক্স ১৩ টাম্পা বে গণমাধ্যমের গতকাল শনিবারের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তল্লাশি–উদ্ধার অভিযানে ‘উই আর দ্য এসেনশিয়ালস’ নামের স্বেচ্ছাসেবীরাও যোগ দিয়েছেন।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার উদ্ধারকারী দলগুলো স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করে। তদন্তকারীরা আগে এই এলাকাতে তল্লাশি চালিয়েছিলেন। এখন মুঠোফোনের তথ্যসহ সাম্প্রতিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) ক্ষতবিক্ষত মরদেহ গত শুক্রবার উদ্ধার করে ফ্লোরিডার স্থানীয় পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফ্লোরিডার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জামিল বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। আর বৃষ্টি পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। জামিল ও বৃষ্টিকে সবশেষ ১৬ এপ্রিল টাম্পায় দেখা গিয়েছিল। তাঁদের খোঁজ না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ ডায়েরি হয়।
জামিল ও বৃষ্টির নিখোঁজ–মৃত্যুর ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের এক মার্কিন যুবককে গত শুক্রবার গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যার (ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার) দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে গত শনিবার।
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যার এই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড বা প্যারোল ছাড়া আজীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
ফক্স ১৩ টাম্পা বে বলছে, এ ছাড়া অন্যান্য অভিযোগেরও মুখোমুখি হচ্ছেন হিশাম। তাঁকে আপাতত প্রাক্-বিচার (প্রি–ট্রায়াল) শুনানি পর্যন্ত জামিন ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। প্রাক্-বিচার শুনানি ২৮ এপ্রিল হওয়ার কথা রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে কিংবা তাদের মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তদন্তকারীরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তের স্বচ্ছতা ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে তারা নির্দিষ্ট তথ্য গোপন রাখছে।
ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চায় বাংলাদেশ: যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বলেন, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকার নিহতদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছে।
সন্দেহভাজন রুমমেট হিশাম কারাগারে: শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির নৃশংস হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘারবেইহকে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
১৬ এপ্রিল ক্যাম্পাস থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই দুই শিক্ষার্থীকে খুঁজছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এফবিআই ও স্থানীয় পুলিশ তাদের অনুসন্ধান শুরু করে এবং ঘটনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা দেয়।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতু এলাকা থেকে নিখোঁজ শিক্ষার্থী লিমনের লাশ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা পরই আরেক নিখোঁজ শিক্ষার্থী বৃষ্টির লাশ উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত।
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ জানিয়েছেন, ফ্লোরিডার ট্যাম্পা বে এলাকায় হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুর ওপর থেকে উদ্ধার করা লাশটি জামিল লিমনের। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পরই তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে। লিমনের রুমমেট হিশামকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। অভিযানে অংশ নেয় বিশেষ সোয়াট টিম। পরে তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে মরদেহ গোপন করা, প্রমাণ নষ্ট করা এবং সহিংসতার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
লিমন ও বৃষ্টি দুজনই বাংলাদেশ থেকে আসা পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
লিমনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৃষ্টির মৃত্যুর বিষয়টিও নিশ্চিত করেন তার ভাই। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে লাশের পরিচয় নিশ্চিত করা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে তদন্তে সহযোগিতা করলেও বর্তমানে হিশাম কোনো তথ্য দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত ও ময়নাতদন্তের কাজ চলমান রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যেন লাশ খুঁজে বের করে- বৃষ্টির বাবা: যুক্তরাষ্ট্রে হত্যার শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ এখনো খুঁজে পায়নি বলে জানিয়েছেন তার বাবা জহির উদ্দিন আকন ওরফে দিল মোহাম্মদ। তার একটাই চাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন মেয়ের লাশ খুঁজে বের করে এবং বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়।
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায়। তাঁর বাবা জহির উদ্দিন দুই যুগের বেশি সময় ধরে রাজধানীর মিরপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত রয়েছেন। তার মেয়ে নাহিদা সুলতানা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) পিএইচডির শিক্ষার্থী ছিলেন।
গতকাল রোববার সকালে নিহত বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মেয়েটাকে আমি শেষবারের মতো দেখতে চাই। বৃষ্টির মা, ভাই সবাই খুব মন খারাপ করে আছে। কান্নাকাটি করছে। সবার মন মরা। এ অবস্থায় আমাদের একটাই আকুতি। ওর মরদেহটা যেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজে বের করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। আমরা এর বাইরে আর কিছু চাই না।’
জহির উদ্দিন আকন বলেন, ‘মেয়ের লাশ পাওয়ার খবরের আশায় গতকাল শনিবার রাত জেগে অপেক্ষা করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ আর ফোন করেনি। তাদের ফোন করার কথা ছিল। পরে আমরা যোগাযোগ করে জেনেছি, তারা (পুলিশ) এখনো বৃষ্টির মরদেহ খুঁজতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পুলিশ লিমনের বাসা থেকে একটি দেহের খণ্ডিত অংশ পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি বৃষ্টির দেহের অংশ। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত বৃষ্টির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি দূতাবাস, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে পুলিশসহ যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটি যোগাযোগ রাখছে। আশ্বস্ত করেছে, বৃষ্টির হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতসহ তার লাশটি খুঁজে পেতে তারা সহযোগিতা করবে। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করতে পারছি না।’
বৃষ্টির পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মিরপুরের নাহার একাডেমি হাইস্কুল থেকে ২০১৪ সালে জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এসএসসি পাস করেন নাহিদা সুলতানা। পরে শহীদ বীর উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকেও জিপিএ-৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে ঢাকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। তবে স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পেলে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান বৃষ্টি।
নিহত বৃষ্টির চাচা দানিয়াল আকন পরিবার নিয়ে মাদারীপুরে গ্রামের বাড়িতে থাকেন। পেশায় তিনি একজন কৃষক। ভাতিজি বৃষ্টিকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি যে আমাদের ছেড়ে এভাবে চলে যাবে, তা আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। ওরা (বৃষ্টির পরিবার) বছরে একবার বড়জোড় দুবার দেশের বাড়িতে আসত। মেয়েটা ছোট থেকেই ঢাকায়। আমার ভাইয়ের মেয়ে ও ছেলে—দুজনই পড়ালেখায় খুবই ভালো। এলাকায় ওদের নিয়ে সবাই গর্ব করত। বৃষ্টির মারা যাওয়ার কথা কেউ মানতে পারছে না। ওর জন্য সবাই কান্না করে যাচ্ছে। যারা বৃষ্টিকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই। আল্লাহ যেন তার বিচার করে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা অবগত রয়েছি। নিহত বৃষ্টির পরিবারের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। একটি আবেদন লাগবে। পরে আমরা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বৃষ্টির লাশ আনাসহ যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠিয়ে দেব। আশা করছি, তার লাশটি পুলিশ খুঁজে পেলেই এই কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ হন লিমন ও বৃষ্টি নামের দুই শিক্ষার্থী। দুজনই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার পিএইচডি শিক্ষার্থী। ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন লিমন। অন্যদিকে নাহিদা পিএইচডি করছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার দুজনকে সর্বশেষ ক্যাম্পাসে দেখা গিয়েছিল।
গত শুক্রবার নিখোঁজ শিক্ষার্থী জামিলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। ফ্লোরিডার হিলসবরোর স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্লোরিডার ট্যাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের কথা জানায়। তাদের নিখোঁজের ঘটনায় হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ নামের ২৬ বছরের আমেরিকার এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। তিনি জামিলের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তবে হিশামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার পারিবারিক বাড়ি থেকে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

