Logo

ফিচার

৩০ হাজার শেফের পথপ্রদর্শক ফৌজি আরা

Icon

বাংলাদেশের প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৪:৩৪

৩০ হাজার শেফের পথপ্রদর্শক ফৌজি আরা

ঢাকার এক ছোট্ট রান্নাঘর থেকে শুরু। সময়টা নব্বইয়ের দশক। শৈশবে সেই রান্নাঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ফৌজি দেখতেন তার মা কীভাবে আটা দিয়ে নানান ডিজাইন বানিয়ে ওভেনে ঢুকিয়ে দিতেন, আর কিছুক্ষণ পর সেই আটা যেন জাদুর ছোঁয়ায় পরিণত হতো বন রুটি, বাটার বন কিংবা কেকের মতো মুখরোচক খাবারে। ফৌজিয়ার চোখ তখন বিস্ময়ে বড় বড়— কীভাবে হয়? কীভাবে এই এক মুঠো আটা, এক চিমটি চিনি, আর সামান্য বাটার এমন বিস্ময়কর রূপ নেয়? সেই বিস্ময়ই তার ভেতরে জন্ম দেয় বেকিংয়ের প্রতি অদম্য এক আগ্রহ।

বাবার হাত ধরেও তিনি রান্নাঘরের কাজ শিখেছিলেন। এসএসসি পরীক্ষার পর যখন একটু অবসর, তখন বাবাই তাকে শেখাতেন রান্না। অতিথিরা এলে সেই রান্না খাওয়াতেন। তারা খেয়ে প্রশংসাও করতেন। সেই প্রশংসাই যেন ছিল প্রথম প্রেরণা।

সময়ের স্রোত বয়ে যায়, ফৌজির আগ্রহ পেশায় রূপ নেয়। ১৯৯৭ সালে তিনি প্রথম উদ্যোগ নেন ‘মাতৃছায়া’ নামে। তবে তার প্রকৃত স্বপ্ন পূরণের সূচনা হয় ২০২০ সালে, করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয় ‘আবরারস কিচেন’। লক্ষ্য ছিল দুইটি— বিশুদ্ধ, ঘরোয়া ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দক্ষ প্রশিক্ষণ দিয়ে মানুষকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা।

আজ, মাত্র পাঁচ বছরে, সেই আবরারস কিচেন থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী। তাদের কেউ চাকরি করছেন দেশে-বিদেশে, কেউ নিজের ব্যবসা গড়েছেন, কেউ আবার ঘরে বসেই আয় করছেন। ফৌজি আরা বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য কেবল খাবার বানানো নয়, উদ্যোক্তা বানানো। একজন উদ্যোক্তা মানে একটি কর্মসংস্থান। আর কর্মসংস্থান মানেই আমাদের দেশের বেকারত্বের শৃঙ্খল একটু একটু করে ছিন্ন হওয়া।’

তার প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের ধরনও ভিন্ন। কেউ যদি সব শিখতে না পারে, তাদের জন্য রয়েছে ছোট ছোট কোর্সে বিভক্ত সুবিধা। বেসিক কেক, অ্যাডভান্স কেক, স্পেশাল কেক, ব্রেড, প্যাটিসেরি— প্রতিটি কোর্সই হাতে-কলমে শেখানো হয়। ন্যূনতম তিন দিন, সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ। আর সেই কয়েক দিনের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা শিখে নেয় কিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেকিং করতে হয়, কিভাবে কম খরচে প্যাকেজিং করা যায়, কীভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে হয়, আর কীভাবে প্রফেশনালি নিজের ব্র্যান্ড দাঁড় করাতে হয়।

ফৌজি গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘বাজারে যেখানে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হয়, আমরা সেখানে বাছাই করা, স্বাস্থ্যসম্মত উপকরণ ব্যবহার করি। যেটা কাস্টমারকে দিচ্ছি, সেটাই আমরা খাই। এখানে কোনো পার্থক্য নেই।’

অবশ্য এই পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে পড়তে হয়েছে নানা বাধার মুখে। সমাজ কখনো পাশে দাঁড়ায়নি, বরং প্রায়শই টেনে ধরতে চেয়েছে। তবে পরিবার, বিশেষ করে মা, বড় বোন, আর দুই মেয়ে— তাদের সমর্থনেই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি। ফৌজি বলেন, ‘সামাজিক বাধা থাকবে, কিন্তু আপনাকে হাঁটতে হবে। লক্ষ্য যদি দৃঢ় থাকে, তাহলে কোনো প্রতিঘাত আপনাকে থামাতে পারবে না।’

তার এই যাত্রা শুধু ব্যবসায়িক নয়, মানবিকও। অসচ্ছলদের জন্য তিনি বিনামূল্যেও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। এর ফলে অনেক নারী এখন ঘরে বসে আয় করছেন, স্বাবলম্বী হয়েছেন। কারও কারও হাতে গড়ে উঠেছে নিজস্ব ছোট্ট প্রতিষ্ঠান। কেউ কেউ আবার বিদেশে গিয়ে পেশাদার বেকার হিসেবে কাজ করছেন।

ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্ন আরও বড়। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আবরারস কিচেন অসহায়দের পাশে দাঁড়াক। আমি একসময় অসহায়ত্ব বোধ করেছি, অসুস্থ হয়েছি। চাই না আর কোনো নারী সেই কষ্ট পায়। চাই এখান থেকে আরও বড় উদ্যোক্তা তৈরি হোক, কর্মসংস্থান তৈরি হোক, আর দেশের বেকারত্ব কমুক।’

নারীদের জন্য তার বার্তা স্পষ্ট— ‘শেখার কোনো বয়স নেই। যখন সুযোগ পাবেন, তখনই শিখুন। হাল ছাড়বেন না। ধৈর্য ধরে কাজ করুন। আপনার এই দক্ষতাই হবে বিপদের সময় আপনার সেরা সঙ্গী।’

ফৌজি আরা বেগম কেবল একজন পেস্ট্রি শেফ নন, তিনি ৩০ হাজার শেফ তৈরির কারিগর। তার হাত ধরে জন্ম নিচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা, নতুন আস্থা, নতুন সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাই হয়তো একদিন দেশের অর্থনীতির চাকা আরও একটু দ্রুততর গতিতে ঘুরতে সহযোগিতা করবে।

‘আবরারস কিচেন’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করা যাবে। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে গেস্ট ট্রেইনার হিসেবেও কাজ করছেন এবং দেশ-বিদেশে অনলাইন-অফলাইন উভয় মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।

এমএইচএস

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর