রাজধানী ঢাকায় অধিকাংশ ভবন বিল্ডিং কোড বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে তৈরি হয়নি। এটি নগরীর বাসিন্দাদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাখ লাখ বহুতল ভবন ঘিরে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দেশজুড়ে পর পর বেশ কিছু অনুভূত ভূমিকম্পের পর নগরীর ভবনগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি আবার সামনে এসেছে সবার। এ নিয়ে চিন্তিত রাজধানীর বাসিন্দারা।
জানা গেছে, ঢাকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২২ লাখ ভবনের মধ্যে ২১ লাখই দুর্বল ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। এসব ভবন নির্মাণে মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। রাজউকের নকশা অনুসরণ করা হয়নি। আবার অনেক ভবন পুরোনো নকশায় নির্মিত। সরকারিভাবে নির্মিত ৩৭ শতাংশ নতুন ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজউকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ১৫ লাখ ভবন দ্বিতল বা এর চেয়ে কম। এগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কম। কিন্তু চার থেকে ৩০ তলা পর্যন্ত বাকি ৬ লাখ ভবন উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
রাজউকের তথ্যমতে, শহরের ৭৪ শতাংশ ভবন গড়ে উঠেছে নকশাবহির্ভূতভাবে। অন্যদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা ধরে ভেঙে ফেলার নির্দেশনা থাকলেও সেটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। সম্প্রতি সেফটি অ্যাওয়্যারনেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সেমিনারে জানানো হয়, রাজউকের নিয়মনীতি না মানায় ঢাকায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এসব ভবন ভূমিকম্পে হতে পারে মৃত্যুপুরী। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের (রাজউক অংশ) অধীনে পরিচালিত জরিপে ঢাকায় সরকারিভাবে নির্মিত ৩৭ শতাংশ নতুন ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এদিকে গত ২১ নভেম্বর ভূমিকম্পের পর ছোট বড় ৩০০ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পে ৩০০টির মতো ছোট বড় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করতে পেরেছি। নিয়ম বহির্ভূত এবং নক্সা বহির্ভূত ভবন নির্মাণে রাজউক ও ভবনমালিক উভয়েরই দায় আছে। তবে, মূল দায়ী ভবনমালিক।
রাজধানী ঢাকায় একটি বড় ভূমিকম্পের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মো. ওয়াহিদ সাদিক। বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনে ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে প্রস্তুতি ও করণীয় শীর্ষক সেমিনার ও মতবিনিময় সভায় তিনি মধুপুর ফাটলরেখায় ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষতির বিশ্লেষণ করেন। তার গবেষণা অনুযায়ী, এই মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানলে ঢাকার মোট ভবনের ৪০ শতাংশের কিছু বেশি অর্থাৎ ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯টি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়তে পারে। ঢাকা শহরে অভ্যন্তরীণভাবে ৮-৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটানোর মতো কোনো বড় ফল্টলাইন না থাকলেও, নিকটবর্তী প্রধান ঝুঁকিটি নিয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবীর জানান, ঢাকা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে মধুপুর অঞ্চলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটার জন্য যথেষ্ট সক্রিয় ফল্ট রয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, এ ধরনের কম্পন যদি হয়, তবে ঢাকার নতুন ভরাট করা অঞ্চলগুলোতে বিরাট বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তার মতে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এমন হতে পারে যে হতাহতের সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে এবং শহরের ভূপ্রকৃতিই বদলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে মানুষের অব্যবস্থাপনাই সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মূল কারণ হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল। তিনি বলেন, ঢাকার চারপাশের জলাভূমি রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চললেও বাস্তবে সেই এলাকাগুলোই সবচেয়ে বেশি দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে।
তার মতে, বড় ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হবে ঠিক ওইসব এলাকায় যেখানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার স্থাপনা দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই, সম্ভাব্য বিপর্যয়ের জন্য প্রকৃতির চেয়ে মানুষের অব্যবস্থাপনাই বেশি দায়ী হবে।
বিকেপি/এমবি

