Logo

স্বাস্থ্য

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

হামের উপসর্গে ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ২১:১২

হামের উপসর্গে ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে এর ভয়াবহতা। গত ১৯ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৯৪ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ৯৪৭ শিশু ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। 

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৭৯২ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৬ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২ হাজার ৫২৭ জন।

এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৯৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে পূর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য সংশোধন করে নিশ্চিত মৃত্যুর তালিকা থেকে পাঁচটি মৃত্যু বাদ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জেলা পর্যায় থেকে ভুল তথ্য পাঠানোর কারণে এসব মৃত্যু জাতীয় প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। বাদ পড়া জেলাগুলো হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৩ জন, লক্ষ্মীপুর থেকে ১ জন এবং চাঁদপুর থেকে ১ জন।

এদিকে, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে হামে আক্রান্ত আরও একজন রোগীর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে অদ্যবধি সারা দেশে হাম সন্দেহে ৫ হাজার ৭৯২ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় ৭৭১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে মোট ৩১৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ৯৪৭ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। একদিনে শনাক্ত হওয়া এসব রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ জনই ঢাকা বিভাগের। তবে এই সময়ে ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন কোনো হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়নি।

পাঁচ জেলায় একদিনে ৫ শিশুর মৃত্যু: ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে ৭৫ রোগী। গত ২৪ ঘন্টায় নতুন ভর্তি হয়েছে ৯ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ১ শিশুর।

কুষ্টিয়ার ভাদালিয়া এলাকার আলামিন ও অন্তরা দম্পতির একমাত্র সন্তান আফরান। হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ৮ দিন ধরে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল আট মাস বয়সী শিশুটি। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) ভোর পৌনে ৬টার দিকে, শিশু ইউনিট-২ এর হাম ওয়ার্ডের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেছে এক শিশুর। চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয় শিশু মাসুদাকে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে ভর্তির জন্য হাসপাতালের ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। তবে ওয়ার্ডে পৌঁছানোর আগেই মারা যায় শিশুটি।

টাঙ্গাইলে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৩ মাসের শিশু সাফার মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে হামের হট স্পট হয়ে উঠেছে গোপালগঞ্জ। এরই মধ্যে ৪৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। নেত্রকোণায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩ জন।  লক্ষ্মীপুরে জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ৩৩ জন।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। এ ছাড়া খুলনা ও সিলেট বিভাগে ৫ জন করে এবং চট্টগ্রামে ৪ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বরিশাল ও রংপুর বিভাগে ১ জন করে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

হামের লক্ষণ: হামের জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে কমপক্ষে ১০-১৪ দিন সময় লাগে। তাই, কার মাধ্যমে এবং কখন ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে তা বোঝা কঠিন। হামের প্রাথমিক উপসর্গগুলো হলো, সর্দি, কাশি, তীব্র জ্বর (১০৩-১০৫ক্কঋ), চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং গালের ভেতরে ছোট সাদা দাগ বা কপ্লিক স্পটের আবির্ভাব। এ উপসর্গগুলো সাধারণত ৪-৭ দিন স্থায়ী হয়।

হামের সবচেয়ে দৃশ্যমান লক্ষণ হলো ত্বকে লাল ফুসকুড়ি (র‌্যাশ)। র‌্যাশ সাধারণত সংক্রমণের ৭-১৮ দিন পরে শুরু হয়, প্রথমে মুখ ও গলার উপরের অংশে দেখা যায়। এটি প্রায় ৩ দিনের মধ্যে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত হাত ও পা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। র‌্যাশ সাধারণত ৫-৬ দিন স্থায়ী হয়, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।

চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল: দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল বৃহস্পতিবার অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর অধীনস্থ সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।

ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী, পরিচালক (প্রশাসন), স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয় যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এটি জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এদিকে, দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্দেশনাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্যও বলা হয়েছে।

হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। তাই জ্বর, সর্দি, কাশি, র‌্যাশ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন