ছবি: সংগৃহীত
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দ্রুত উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। গত ২২ দিনে সারা দেশে হাম সন্দেহে ৭ হাজার ৬১০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১১৩ জনের; এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ১৭ জন।
শুধু গত ২৪ ঘণ্টায়ই নতুন করে ৬৫৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে।
একই সঙ্গে এপ্রিল মাসে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ নমুনায় হাম শনাক্ত হওয়ায় সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হচ্ছে এবং পরীক্ষাগারগুলোতেও বাড়ছে তীব্র চাপ।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে, যা জনঘনত্ব ও সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকিকে সামনে নিয়ে আসে।
সরকার ইতোমধ্যে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যা পর্যায়ক্রমে ১২ এপ্রিল থেকে সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ৩ মে থেকে সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনা হচ্ছে, কারণ আক্রান্তদের বড় অংশই এই বয়সসীমার মধ্যে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গত বছর টিকাদানের হার কমে যাওয়াই এবারের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে হাম ও হাম সন্দেহে মৃত্যু ও শনাক্তের তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হাম সন্দেহে ৭ হাজার ৬১০ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে পরীক্ষায় ৯২৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম সন্দেহে ১১৩ জন শিশুর মৃত্যু হলেও নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি হাম সন্দেহে আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে মোট আক্রান্ত হয়েছে ৩২৫৯ জন শিশু, এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৪৬৮ জন।
অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম সন্দেহে ৬৫৪ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে।
হাম সন্দেহে গত এক দিনে ১২ শিশুর মৃত্যু: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত ও এ রোগের লক্ষণ নিয়ে ১২ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে দুজন হাম আক্রান্ত ছিলেন এবং ১০ জন মারা গেছেন উপসর্গ নিয়ে। একই সময়ে নতুন করে ৫৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
এছাড়া ৯৮৪ জন লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসেন, যাদের মধ্যে ৬৫৪ জনকে ভর্তি করা হয়েছে।
শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার হাসপাতালগুলোতে সবচেয়ে বেশি ২৬৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে, রংপুরে ভর্তি হয়েছেন ১১ জন। মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঢাকায় একজন এবং জেলাগুলোর মধ্যে খুলনায় সর্বোচ্চ পাঁচজন মারা গেছেন।
হাম-রুবেলার টিকাদান শুরু ৩০ উপজেলায়: হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার।
৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুরা হাম-রুবেলার টিকা পাবে। কেউ আগে পেয়ে থাকলেও চলমান ক্যাম্পেইনে টিকা নিতে পারবে। টিকা প্রদান কার্যক্রম চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
রোববার সকাল ৯টা থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় একযোগে এই কর্মসূচি শুরু হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সকালে ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
এ সময়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের পরিস্থিতি বর্তমানে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। মূলত যেসব এলাকায় সম্প্রতি হামের প্রকোপ বেশি দেখা গেছে, সেসব ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষ কার্যক্রমের আওতাভুক্ত এলাকাগুলো হলো- বরগুনা সদর ও পৌরসভা। পাবনা সদর, পৌরসভা, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া। চাঁদপুর সদর, পৌরসভা ও হাইমচর। কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু। গাজীপুর সদর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, পৌরসভা, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট। নেত্রকোনার আটপাড়া। ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, তারাকান্দা ও শ্রীনগর। রাজশাহীর গোদাগাড়ী। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ। নওগাঁর পোরশা। যশোর সদর ও পৌরসভা। নাটোর সদর। মুন্সিগঞ্জ সদর, পৌরসভা ও লৌহজং। মাদারীপুর সদর ও পৌরসভা। ঢাকার নবাবগঞ্জ। ঝালকাঠির নলছিটি। শরীয়তপুরের জাজিরা।
যেসব শিশুর জ্বর রয়েছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদের এই সময়ে টিকা না দিয়ে সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।
টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি আক্রান্ত বা জ্বর আছে- এমন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সারা দেশে ৩ মে থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি: দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী ৩ মে থেকে সারা দেশে ‘বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি’ শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তার আগে আগামী ১২ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকির দুই সিটি করপোরেশন ও দুই জেলায় এ কার্যক্রম চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
হামের টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ৩ মে থেকে, অর্থাৎ আগামী মাসের তিন তারিখ থেকে সারা দেশের সকল জেলা, সকল উপজেলায় একযোগে আমরা এই টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাব ইনশাল্লাহ।
তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ‘সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ’ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় রোববার টিকাদান শুরু হয়েছে।
এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ময়মনসিংহ ও বরিশাল জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান মন্ত্রী।
পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১২ এপ্রিল থেকে চারটি সিটি করপোরেশন এবং ৩ মে থেকে দেশের বাকি সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে হামের টিকা দেওয়া হবে।
এপ্রিলে প্রতিদিন গড়ে হাম শনাক্তের হার ৩৫ শতাংশ, ল্যাবে বাড়ছে চাপ: চলতি এপ্রিল মাসে হাম শনাক্তের হার প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সংক্রমণের পাশাপাশি ল্যাবে বাড়ছে নমুনা পরীক্ষার চাপও।
রোববার দুপুরে রাজধানীর মহাখালী জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ভাইরোলজি বিভাগের হাম ও রুবেলা পরীক্ষাগার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক দিনে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ওঠানামা করলেও সার্বিকভাবে তা ঊর্ধ্বমুখী। ৩১ মার্চ ১৪১টি নমুনার মধ্যে ৭১টি (প্রায় ৫০%), ১ এপ্রিল ১৮৯টি নমুনার মধ্যে ৬৪টি (৩৪%) পজিটিভ পাওয়া যায়, ২ এপ্রিল ২৮৮টি নমুনার মধ্যে ১০৬টি (৩৭%) এবং ৩ এপ্রিল ২৮৫টি নমুনার মধ্যে ৬৯টি (২৫%) পজিটিভ পাওয়া যায়, ৪ এপ্রিল ১৪৬টি নমুনার মধ্যে ৭০টি (৪৭%) শনাক্ত হয়।
এ ছাড়া রোববার বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩৬০টি নমুনা পরীক্ষার জন্য জমা পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামে প্রতিবছর কতজন আক্রান্ত হয়, তার হিসাব নিয়মিত করা হলেও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। দেশে হামে মৃত্যুর হার ছিল ১০ লাখে ১ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
ডব্লিউএইচওর দেওয়া বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে ৯ হাজার ৭৪৩টি হাম রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৯৩৪; যা ওই সময়ের বড় প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত দেয়। এরপর ২০০৬ সালে তা নেমে আসে ৬ হাজার ১৯২-এ। ২০০৭ সালে ২ হাজার ৯২৪, ২০০৮-এ ২ হাজার ৬৬০, ২০০৯-এ ৭১৮, আর ২০১০ সালে ৭৮৮। অর্থাৎ ২০০৪ থেকে ২০০৫-এর ভয়াবহ অবস্থার পর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত কমে আসে।
এরপরও বাংলাদেশ হামকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ডব্লিউএইচওর পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১১ সালে দেশে হাম রোগীর সংখ্যা আবার লাফ দিয়ে ৫ হাজার ৬২৫-এ ওঠে। ২০১২ সালে তা ১ হাজার ৯৮৬-এ নেমে আসে। ২০১৩ সালে ২৩৭, ২০১৪ সালে ২৮৯, ২০১৫ সালে ২৪০—এই তিন বছর তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে আবার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৭২। পর্যালোচনা বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৬ সময়ে টিকাদান বাড়লেও ২০১৬ সালে আবার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
দেশে দুই দফায় শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়। প্রথমে ৯ মাসে, পরে ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয় দ্বিতীয় ডোজ। প্রথমে হামের টিকা এক ডোজ দেওয়া হতো। ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় ডোজের হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়।
দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। প্রাথমিক পর্যায়ে শহরাঞ্চলে এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়। পরে ১৯৮৫ সাল থেকে সম্প্রসারিত আকারে দেশের গ্রামাঞ্চলেও এই কার্যক্রম চলতে থাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে।
ইপিআই কর্মসূচির শুরুতে ৬টি সংক্রামক রোগ- যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও ও হামের টিকা দেওয়া হতো। পরে হেপাটাইটিস বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, রুবেলা এবং নিউমোক্কাল নিউমোনিয়া টিকাও যুক্ত করা হয় এ কর্মসূচিতে।
ইপিআই শুরুর ৬ বছর পর ১৯৮৫ সালে দেশের মাত্র ২ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। ইপিআই কভারেজ ইভাল্যুয়েশন সার্ভে ২০১৯-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই হার এখন ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
চলতি বছর হাম বৃদ্ধির পেছনে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে টিকাদানের নিম্নহারকেই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘গত বছর আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হামের টিকা দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। সেখান থেকে পিছিয়ে গেল দেশ।’
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

