Logo

স্বাস্থ্য

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব

Icon

হাসান রাজীব

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ২১:৪৮

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব

দেশ বর্তমানে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখনও পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ও আক্রান্ত বেড়েই চলেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে মোট ৪০ হাজার ৪৯১ শিশুর মধ্যে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৭ হাজার ৮১৬ শিশু, যাদের মধ্যে ২৪ হাজার ৯০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। 

সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের মধ্যে একজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বাকি ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জনে।

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় তিনশ শিশুর মৃত্যুর খবরের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রার ৮১ শতাংশ শিশু হামের টিকার আওতায় এসেছে। এখন এক্ষেত্রে কোনো ‘ঘাটতি’ বা ‘দুর্বলতা’ নেই। 

তিনি বলেন, বাকি শিশুদেরও খুব শিগগির টিকার আওতায় আনা হবে। টিকার ‘যথেষ্ট মজুদ’ থাকার দাবি করে তিনি বলেন, হামের টিকা দেওয়া চলছে। টিকা না পাওয়ার সংখ্যা কমে আসছে। পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে এবং মৃত্যুর হারও কমে আসছে। তবে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে একটু সময় লাগে।

রোববার (৩ মে) বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শিগগির সবাইকে টিকার আওতায় আনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখনও চলছে অভিযান। আর দুই-চার দিনের ভেতরে ১০০ শতাংশ লক্ষ্য কভার করে ফেলব হামের টিকার ব্যাপারে। আমাদের কোনো রকম স্টক ঘাটতি নেই, কোনো রকম দুর্বলতা নেই এই ব্যাপারে ইনশাআল্লাহ।’

এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে জেলা প্রশাসকদের কী নির্দেশনা দেওয়া হল- এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ওনাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছি। যেমন- ডেঙ্গু আসছে এই যে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দেওয়ার জন্য বলেছি। কাউন্সেলিং করার জন্য, মায়েদেরকে ব্রেস্ট ফিডিং যাতে বৃদ্ধি করে, বাচ্চাদের যেন ব্রেস্ট ফিডিং করানো, যাতে শাক খাওয়ার অভ্যাস করেন। অ্যান্টি র‌্যাবিসের যেহেতু এখনও দরপত্রের বিপরীতে মালটা পাইনি, কোনোক্রমে একটা অ্যান্টি র‌্যাবিস ভ্যাকসিন এবং অ্যান্টি স্নেক ভেনম যেটা, এটার যাতে ঘাটতি না হয়। সবসময় স্টকটার প্রতি খেয়াল রাখা এবং যারা যেভাবে অতীতে করে আসতেছে এটাকে আরও সুন্দরভাবে দৃষ্টি রাখা যাতে একটাও জলাতঙ্কের রোগী যেন ফেরত না যায়।’

এ সময় হামের টিকার বিষয়েও তাদের নির্দেশনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৮১ শতাংশ কভার করে নিয়েছি ইনশাআল্লাহ। ভ্যাকসিন দেওয়া, সেটারও প্রত্যেকটা ক্যাম্পের প্রতি যেন ওনারা দৃষ্টি রাখেন, এই ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়েছি। ক্লিনিকগুলো যেগুলো অপরিকল্পিতভাবে হয়েছে, যেগুলো অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কমপ্লায়েন্স করতেছে না, সেগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে পরিদর্শন করা। ডিসপেনসারিগুলোতে ভেজাল ওষুধ বিক্রি করে কিনা, এইগুলো খেয়াল রাখা। মানে সার্বিক দিক থেকে স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করার লক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে ইচ্ছা, সরকারের যে প্রতিশ্রুতি, জনগণের দুয়ারের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, এটার লক্ষে যত রকম কার্যক্রম গ্রহণ করা যায়, সম্মানিত জেলা প্রশাসকদের কাছে সেই সহযোগিতা কামনা করেছি।’

এদিকে, রোববার প্রকাশিত হামের পরিস্থিতি-সংক্রান্ত নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০ শিশুর মধ্যে একজনের শরীরে সরাসরি হাম শনাক্ত হয়েছিল। বাকি ৯ জনের ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগে নতুন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪ জন, বরিশালে ২ জন, চট্টগ্রামে ১ জন, খুলনায় ১ জন এবং সিলেটে ১ জন শিশু মারা গেছে। একজন শিশুর মৃত্যু ঢাকায় নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে বলে জানানো হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ১৬৬ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে এবং নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে মোট ৪০ হাজার ৪৯১ শিশুর মধ্যে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৭ হাজার ৮১৬ শিশু, যাদের মধ্যে ২৪ হাজার ৯০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৩১৩ শিশুর শরীরে সরাসরি হাম শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ২৪৪ জনের, আর নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৫০ জন শিশু।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত সংখ্যক শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এদিকে, হামে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার ঘাটতি থাকায় রোগীরা বড় শহরে আসছেন। এর চাপ পড়ছে ঢাকাতেও। হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে হাম আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে। যদিও এর মধ্যেই সারা দেশে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে।

ইতোমধ্যেই টার্গেটের প্রায় ৮১ শতাংশ টিকা দেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু এরপরও হামের সংক্রমণ কমছে না, মৃত্যুও থামছে না। এর পেছনে অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ‘যদি ভালোমতো রোগীদের ম্যানেজ করা যেত, ঠিকমতো আইসোলেশন করা যেত, তাহলে দুটো কাজ হতো। একটা হলো আমরা রোগীর সংখ্যা কমাতে পারতাম। আরেকটা হলো মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে পারতাম।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনে করছে, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন স্থিতিশীল। কারণ টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে এরকম স্থিতিশীল থাকলেই যে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে সেরকমটা মনে করছেন না ডা. বে-নজীর আহমেদ।

দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আক্রান্ত হওয়াই নয়- হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও শিশুদের জন্য ঝুঁকি থেকে যায় দীর্ঘদিন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও স্নায়বিক জটিলতার মতো গুরুতর সমস্যায় ভুগতে পারে অনেক শিশু।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। পরে ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী আরও বড় পরিসরে টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, টিকাদান কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাব চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকেই দেখা যাবে। মে মাসের মধ্যেই হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

একটি বেসরকারি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিশু বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম প্রথমেই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানে। রোগ সেরে গেলেও কিছু সময় শিশুর শরীর দুর্বল থাকে। এ সময় অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

তিনি জানান, হাম আক্রান্ত শিশুদের মুখে ঘা হওয়া সাধারণ ঘটনা। এতে তারা ঠিকমতো খেতে পারে না, ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। একইসঙ্গে শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি তৈরি হয়, যা চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

তার ভাষ্য, ভিটামিন ‘এ’ কমে গেলে চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, কর্নিয়া ঝাপসা হতে পারে। চিকিৎসা না হলে কর্নিয়ায় ঘা তৈরি হয়ে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে।

ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা আরও বলেন, কিছু ক্ষেত্রে হাম শিশুর মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। এতে খিঁচুনি, দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যা বা বিকাশগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। এছাড়া কানে সংক্রমণ হয়ে শ্রবণশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি জানান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এতে ফুসফুসে ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে।

কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, হাম থেকে সেরে ওঠা শিশুর খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে। চোখের সুরক্ষায় ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার যেমন লালশাক, পালংশাক, শালগম ও মিষ্টিকুমড়া খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস অন্তর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

মায়ের দুধের বিকল্প নেই: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম বয়সী শিশুদের জন্য মায়ের বুকের দুধ সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশু, যাদের হামের টিকা দেওয়া যায় না, তারা মায়ের দুধ থেকেই রোগ প্রতিরোধী উপাদান পেয়ে থাকে।

তাই হাম প্রতিরোধে টিকা যেমন জরুরি, তেমনি আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর সঠিক পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন