Logo

স্বাস্থ্য

পরিবারের সঙ্গে বোঝাপড়ার চেষ্টা আদ-দ্বীন হাসপাতালের

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ২৩:১৮

পরিবারের সঙ্গে বোঝাপড়ার চেষ্টা আদ-দ্বীন হাসপাতালের

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় চরম অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নোটিশের জবাব না দিলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। 

রোববার (৭ জুন) নোটিশের জবাব দেওয়ার সময়সীমা শেষ হবে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো উত্তর দেয়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র।

এদিকে মন্ত্রণালয় থেকে করা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারই অংশ হিসেবে শনিবার (৬ জুন) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে উক্ত ঘটনার আইনি দিক, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অবস্থান এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ কর্মীদের সামনে হাসপাতালের পক্ষে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির। 

এর মাঝেই শোকজের জবাব না পেলে আইন অনুযায়ী আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

এদিকে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তদন্তে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার পর এরই মধ্যে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলসহ কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এ সিদ্ধান্তকে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সরকার।

এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সম্ভবত মৃত্যুর কারণ ছোট কক্ষে দীর্ঘ সময় এসি না থাকা। প্রয়োজনীয় এসি না থাকায় ঘটনাস্থলে অক্সিজেন স্বল্পতা হয়। যে কারণে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, রোববারের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমার আইনে যতটুকু কঠোর (হার্ড) হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাব। এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না

এদিকে হাসপাতালকে দেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিশে বলা হয়, ২৭ মে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে ১ জুন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তদন্তকালে কমিটি হাসপাতালের ডিজি, এডি, শিশু বিভাগের প্রধান, এনআইসিইউতে কর্মরত চিকিৎসক, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত নার্স, আয়া এবং রোগী ও রোগীর অ্যাটেনডেন্টসহ মৃত নবজাতকদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য গ্রহণ করে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আদ-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালনায় The Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982 অধ্যাদেশের বিধানসমূহ যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। এই নিয়মের চরম অবহেলার কারণেই ওই ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী সাব্যস্ত করেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আদ-দ্বীন হাসপাতালটি উক্ত অধ্যাদেশের ৮ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধিত। তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলায় ধারা মোতাবেক কেন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, তার যৌক্তিক কারণ আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে বা লিখিতভাবে জানানোর জন্য আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।

আদ-দ্বীনের সংবাদ সম্মেলন: ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তবে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে নন তারা।

শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে মারা যাওয়া এক শিশুর বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা চাই যে প্রকৃত দোষী, তারই শাস্তি হোক। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ ঘোষণা আমরা চাই না।’

তিনি বলেন, ‘এ হাসপাতালে আমার আগেও দুটি সন্তানের জন্ম হয়েছে। তারা সুস্থ অবস্থাতেই ছিল। তাই একটি ঘটনার জন্য পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হোক, সেটা আমরা চাই না।’

ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং তাদের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, শিশুদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ওয়ার্ডে অক্সিজেন স্বল্পতা ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে অক্সিজেনের মাত্রা কতটুকু ছিল, কার্বন ডাই অক্সাইড কী পরিমাণে ছিল সেটার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। আরেকটি প্রশ্ন কতটুকু অক্সিজেন থাকলে শিশুর মৃত্যু ঘটবে না সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এখানে অস্পষ্টতা থেকে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

শোকজের জবাব না পেলে আদ-দ্বীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে-স্বাস্থ্যমন্ত্রী: ছয় শিশু নিহতের ঘটনায় দেওয়া শোকজের জবাব না পেলে আইন অনুযায়ী আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

শনিবার দুপুরে ঢাকার মিন্টো রোডের নিজ বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। 

আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’ 

মন্ত্রী জানান, জনস্বার্থে ও মানুষের জীবনের স্বার্থে আইনানুযায়ী শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রোববার বিকালের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে এবং সেই উত্তর সন্তোষজনক না হলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় একটি ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের দাবি যাই হোক না কেন, তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন