ছবি: সংগৃহীত
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১৮৮টি শিশু।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৯০২ শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ১০০ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট এক হাজার দুটি শিশু মারা গেছে।
এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় ৬৯টি শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা এক হাজার ১১৯। এই সময়ে এক হাজার ৩৪টি শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৯৬৯টি শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা এক লাখ ৬৭ হাজার ৫৮০, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৯০৪। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৯৩ রোগী, যাদের মধ্যে এক লাখ ৪১ হাজার ৮১৯ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।
এত মৃত্যু আগে হযনি: হাম ও এর উপসর্গে এত শিশুর মৃত্যু দেশের ইতিহাসে আগে ঘটেনি। গত প্রায় আট বছর ধরে মৃত্যু দূরে থাক, হামে সংক্রমণ সংখ্যা ৪০০’র বেশি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। আর এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার একেবারে উল্টো হয়ে গেল পরিস্থিতি।
২০২৫ সালে অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় হামের টিকা দেওয়ার কাজে চরম অবহেলার এর পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সে বিষয়ে কোনো নজর দেওয়া হয়নি। মার্চ মাস থেকে হাম বাড়তে শুরু করে ব্যাপকভাবে। কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এপ্রিল থেকে মে মাসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাসজুড়ে চলে গণটিকাদান। কিন্তু সে সময়ও প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পরে যায়।
গত সোমবার হামে মৃত্যুর সংখ্যা যখন হাজার ছুঁইছুঁই, সেদিন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেছিলেন, ‘হামে এত মৃত্যু আমার জানা মতে এদেশে আগে হয়নি। এত সংক্রমণও হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য, এর শিকার হলো শিশুরা।’
বাংলাদেশ এ বছর হাম সংক্রমণে শীর্ষে উঠে এলেও আগের বছরগুলোয় চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালে রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২, ২০২২ সালে ৩১১ জন।
জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, এবার বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে হামে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এত হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড নেই। এটা নজিরবিহীন।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ছিল আলোচিত। নিয়মিত টিকাদান, জাতীয় ক্যাম্পেইনের কারণে হামসহ এ ধরনের রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো যাচ্ছিল। এখন সংকট দেখা দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডব্লিউএইচওর তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালের জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে নয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সী তিন কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই বা ১০০ শতাংশ অর্জিত হয়েছিল।
২০১০ সালে ফলোআপ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা ছিল নয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া। সেবারও কাভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা কর্মসূচির মাধ্যমে নয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী পাঁচ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছিল। সেবার কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
২০২০–২১ সালের পর বিশেষ ক্যাম্পেইন আর হয়নি। এর মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে এ হার ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকার স্বল্পতাও দেখা দেয়।
জাতিসংঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া ৫ মে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হবে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
এবার প্রাদুর্ভাবের পর গত এপ্রিলে বর্তমান বিএনপি সরকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করে, কিন্তু তাতেও ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। কারণ, হামের টিকা দিতে এই বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুর হিসাব করা হয়, কিন্তু গত জুনে একই বয়সী দুই কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে আওতায় আনা হয়।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

