দেশব্যাপী টিকাদান শুরু
হাম-রুবেলার টিকা পাবে ৩৪ লাখ শিশু
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩৫
# হামের টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
# বাদ পড়া শিশুরাও এবার টিকা পাবে
# হামের উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু
দেশব্যাপী হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে প্রথম দফায় টিকার বাইরে থাকা প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার আওতায় আনতে দ্বিতীয় দফার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। টিকাদানের এ ক্যাম্পেইন চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। শনিবার সকালে রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তির টিএনটি খেলার মাঠে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালের পর নিয়মিত চার বছর পরপর পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও এমআর টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ছিল। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ভাগ্যক্রমে কিংবা দুর্ভাগ্যবশত, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই চার বছরের খেসারত আমাদের ওপর এসে পড়েছে। আমাদের জাতিকে, আমাদের মায়েদের অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে, অনেক মায়ের বুক খালি হয়ে গেছে। এ জন্য আমি সত্যিই ব্যথিত।
বিভিন্ন মহামারিতে চিকিৎসকদের অবদানের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের চিকিৎসকেরা সব সংকট ও জরুরি পরিস্থিতিতে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা আমাদের ডাক্তারদের কাছে ঋণী। করোনাকালে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ও প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমাদের চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং শতাধিক চিকিৎসকের আত্মত্যাগের কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুহার তুলনামূলক কম ছিল। এটি আমাদের নিজস্ব চিকিৎসকদের অবদান ও প্রচেষ্টার ফল।
তিনি আরও বলেন, পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়ে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় চিকিৎসকদের উদ্ভাবন ও সেবারও প্রশংসা করেন তিনি।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা গড়ে তোলা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। হাম ও অন্যান্য মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমাজের সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ রাখা এবং ওপেন টেন্ডার সিস্টেমের অজুহাতে বিদেশ থেকে ভ্যাকসিন আমদানিতে আগের সরকারের দীর্ঘসূত্রতা ও গাফিলতির খেসারত জাতিকে দিতে হয়েছে। অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে।
তিনি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে জানান, প্রায় এক কোটি ৮৫ লাখ শিশুর মধ্যে এক হাজারের মতো শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। প্রতিটি শিশুর মৃত্যু সরকারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক।
মন্ত্রী আরও জানান, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গত ৫ এপ্রিল থেকে তিন পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। সর্বশেষ গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী এই কর্মসূচিতে প্রায় এক কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া আরও ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য এই ক্যাম্পেইন আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনের জন্য ১০ লাখ টিকা সংরক্ষিত আছে, স্বাভাবিক টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে এই টিকা দেওয়া অব্যাহত থাকবে।
হাম ছড়ানো শুরু হওয়ার প্রায় সাত মাস পর বাদ পড়া শিশুদের টিকা দিতে এই বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করছে সরকার। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, সংক্রমণের এলাকা শনাক্ত করে সব ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া এবং রোগী থেকে সংক্রমণ ঠেকানোর উদ্যোগ ছাড়া হাম নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। তবে ২৮ জুনের জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে একই বয়সী ২ কোটি ২৩ লাখ শিশু অংশ নেওয়ায় প্রায় ৪৩ লাখ শিশু টিকার বাইরে থাকার বিষয়টি শনাক্ত হয়। তাদের অন্তর্ভুক্ত করতেই দ্বিতীয় দফার এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
মার্চ মাসের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সাত মাস পরেও হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের গতকাল শুক্রবারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ১ হাজার ২০১ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে তিনজন।
সাত মাসের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এ বছর হামে ১ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮৩ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০১ জন মারা গেছে। এই সময় সারা দেশে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৩ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসে। এই সময় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয় ২১ হাজার ১৫ জনের। গতকাল সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রধান উপায় টিকা। আমরা ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনতে চাই। ইপিআইয়ের মাধ্যমে নিয়মিত টিকাদান চলবে, পাশাপাশি ক্যাম্পেইনও চলবে।’
পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই স্বাস্থ্য বিভাগ ৫ এপ্রিল হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করে। প্রথমে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায়; ১২ এপ্রিল থেকে চারটি সিটি করপোরেশনে (ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল) এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে। তখন ওই বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। পরে হিসাব করে দেখা গেছে, ওই বয়সী শিশুর সংখ্যা আরও ৪৪ লাখ বেশি। ওই ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। ওই সময় টিকাদানের হিসাবে দেখা যায়, কোনো কোনো এলাকায় ১০০ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, কোনো কোনো এলাকায় ৫৯ মাসের বেশি বয়সী শিশুরা টিকা নিয়েছে, তাই হিসাব বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ জরিপ করে বিভিন্ন শহরে ও গ্রামে টিকা না পাওয়া অনেক শিশুর সন্ধান পায়। ক্যাম্পেইনের পরেও বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়া চলতে থাকে।
হামের উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯০৭ জন। হাম শনাক্ত হয়েছে ৮৪ জনের শরীরে।
এ নিয়ে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়াল ৯৮৬ জনে। নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে ১০১ জনের।
অপরদিকে হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৫৫। গত শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, খুলনা ও কুমিল্লায় এই তিন জন মারা গেছে।
হামের উপসর্গে মোট প্রাণহানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৪৪ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এরপরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৭৩ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহে ৭৮, চট্টগ্রামে ৭৯, বরিশালে ৬০, খুলনায় ৪৪ ও রংপুর বিভাগে ১৫ জন মারা গেছে।
হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ভর্তি ৩২২ জন, চট্টগ্রামে ২৪২, সিলেটে ১৩১, বরিশালে ৯৫, খুলনায় ৩২, ময়মনসিংহে ৬২, রাজশাহীতে ১৪ ও রংপুরে ৯ জন।
গত ১৫ মার্চ থেকে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব রাখছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাসপাতালে আসা সব রোগী কিংবা হাসপাতালের বাইরে থাকা রোগীদের সবার হাম পরীক্ষা হয় না। ফলে হাম শনাক্ত হওয়া রোগীর সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায় না। কেবল হাসপাতালে আসা বা ভর্তি রোগীর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

