চারণ কবি বিজয় সরকারের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী আজ
নড়াইল প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৫
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি
একুশে পদকপ্রাপ্ত চারণ কবি বিজয় সরকারের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী আজ শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি)। দিনটি উপলক্ষে কবির জন্মস্থান নড়াইল সদর উপজেলার ডুমদিতে ও পার্শ্ববর্তী টাবরা গ্রামে তার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন, বিজয়গীতি পরিবেশন, আলোচনা সভাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
বিজয় সরকার ফাউন্ডেশনের সদস্য ও বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ভবরঞ্জন রায় জানান, দিনব্যাপী এসব অনুষ্ঠান সফল করতে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুরস্রষ্টা, গীতিকার ও গায়ক, চারণ কবি বিজয় সরকার ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নবকৃষ্ণ অধিকারী এবং মায়ের নাম হিমালয়া দেবী। শৈশবকাল এবং জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে প্রিয় জন্মভূমি ডুমদিসহ নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায়। ছেলেবেলা থেকেই কবিতা, গান রচনা ও সুরের মধ্যে ডুবে থাকতেন তিনি। তাই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় বেশিদূর এগোতে পারেননি।
পরবর্তী সময়ে গানের দল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। প্রায় এক হাজার ৮০০ গান রচনা করেছেন এই গুণী শিল্পী। লিখেছেন অনেক কবিতাও। কবিগানের আসরেও দুর্দান্ত ছিলেন তিনি। মঞ্চে তৎক্ষণাৎ আধ্যাত্মিক গান রচনা ও পরিবেশন করে উপস্থিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন। তার গানের কথা ও সুরের মাঝে তিনি আজও বেঁচে আছেন হাজারো মানুষের হৃদয়ে।
বিজয় সরকার লিখেছেন, ‘এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনিই ঠিক রবে, সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে’ কিংবা ‘তুমি জানো নারে প্রিয়, তুমি মোর জীবনের সাধনা’-এর মতো কালজয়ী সব গান।
শিল্পীর মৃত্যুর ৪০ বছরেও অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে তার বসতভিটা। নির্মিত হয়নি স্মৃতিসংগ্রহশালা। বিজয় সরকারের বাড়িতে যাওয়ার পাকা রাস্তাটিও চলাচল অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। এতে ভোগান্তি বেড়েছে দর্শনার্থীদের।
জেলা শহর থেকে আসা শুভ সরকার বলেন, এমন একজন মানুষের বসতভিটা আমি দেখতে এসেছি। যাকে নিয়ে মানুষ গবেষণা করে। কিন্তু খুবই দুঃখজনক বিষয় তার জন্মভিটায় কোন জাদুঘর তো দূরের কথা, তার যে ঘরটি আছে সেটিও অযত্নে। ঘরের ভিতর তার ব্যবহৃত খাট সেখানেও ময়লা আবর্জনায় ভরা। আমরা সরকারের কাছে আবেদন করি। যাতে করে তার এই সংগ্রহশালা যেন সংস্কার করে। যাতে করে দেশ বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা এসে কিছু দেখতে পাবে।
এছাড়া বিজয় সরকারের গান সংরক্ষণেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্টদের। তার গাওয়া গান প্রচার ও প্রসারে যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতুল হাজরা বলেন, ‘বিজয় সরকার বাংলাদেশ লোক সংগীতের স্রষ্টা বলি বা মহাজন বলি তিনি এদেশের এক জন খ্যাতিমান পুরুষ। বিজয় সরকারের গান প্রচার- প্রসারের ক্ষেত্রে আমরা কতটাা ভূমিকা রাখছি ঠিক আমি জানি না৷ তবে এটাকে আরো প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে আরো যত্নবান হওয়া উচিত। বিজয় সরকারের গানের সুর ও বাণী বিভিন্ন জনে এলোমেলো ভাবে পরিবেশন করে থাকে। আমাদের সকলের কাছে দাবি থাকবে বিজয় গান আমরা কেউ বিকৃত না করি। সঠিক ভাবে এটা কে প্রচার করি।’
এ ব্যাপারে নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, ‘এখানকার জন্য আলাদা করে মন্ত্রণালয়ের কোনো বরাদ্দ আমাদের কাছে নেই।তবে কিছুদিন আগে আমরা বিজয় সরকারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমরা দেখেছি, ওখানে একটু জায়গা আছে, তাতে পুরাতন একটি ঘর আছে। আমরা সেটাকে সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছি। কিছুদিনের মধ্যে বাড়ির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে৷ স্মৃতি ধরে রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করছি।’
কবিগানে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ‘চারণ কবি’ ও ‘সরকার’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৮৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কেউটিয়ায় তার মৃত্যু হয় এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৩ সালে উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই চারণ কবিকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
কৃপা বিশ্বাস/এমএইচএস

