Logo

ক্যাম্পাস

আকস্মিকভাবে ডিন ও রেজিস্ট্রার পরিবর্তন

উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দ্বন্দ্বে স্থবির পবিপ্রবি ক্যাম্পাস

Icon

পবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৫

উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দ্বন্দ্বে স্থবির পবিপ্রবি ক্যাম্পাস

উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম (বামে) ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহান (ডানে)

উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিংয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)। এই দ্বন্দ্ব-বিভাজনের কেন্দ্রবিন্দু গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭তম রিজেন্ট বোর্ডের সভা ও একই মাসে অনুষ্ঠিত পদোন্নতির বাছাই বোর্ড।

উপ-উপাচার্যের পক্ষের অভিযোগ— রিজেন্ট বোর্ডের সভায় গৃহীত হয়নি এমন সিদ্ধান্ত রিজেন্ট বোর্ডের নামে অফিস আদেশ জারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছেন উপাচার্য। আলোচ্যসূচির ৭ নম্বর অনুযায়ী ২৪ জনের মধ্যে ২১ জনের পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন স্থগিত রেখে মাত্র তিনজনের ক্ষেত্রে তা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাছাই বোর্ডের সুপারিশের পর নতুন করে আরেকটি কমিটি গঠন করেন ভাইস-চ্যান্সেলর, যা বিধিবহির্ভূত। পুনরায় আবেদন ও ব্যক্তিগত ফাইল পর্যালোচনা করে ২৪ জনের পরিবর্তে মাত্র তিনজনকে পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়নের জন্য সুপারিশ করে ওই কমিটি।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের অনুসারী মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. এবিএম সাইফুল ইসলামের পদোন্নতি এবং অধ্যাপক জামাল হোসেনের স্ত্রী জিনাত নাসরিন সুলতানার সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের বিষয়টিও রিজেন্ট বোর্ডে অনুমোদন পায়নি। এসব সিদ্ধান্ত নিজেদের অনুকূলে না আসায় শিক্ষকদের একটি অংশ রিজেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান তথা উপাচার্যের ওপর দোষারোপ শুরু করেন বলে জানা যায়। এতে পবিপ্রবির শিক্ষকরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। বিজয় দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে উপ-উপাচার্যের গ্রুপটির সঙ্গে উপাচার্যের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষ আলাদাভাবে বিজয় দিবস উদযাপন করে।

এর ফলশ্রুতিতে শীতকালীন অবকাশ শেষে ২৮ ডিসেম্বর ক্যাম্পাস খুললে উপ-উপাচার্য গ্রুপ রেজিস্ট্রার অপসারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এমনকি রেজিস্ট্রারকে ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে উপ-উপাচার্যের অনুসারী এক শিক্ষক কর্তৃক হেনস্তার ঘটনাও ঘটে। পরবর্তীতে রেজিস্ট্রার নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উপাচার্যকে অবহিত করলে তিনি ১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেন। পাশাপাশি কর্মকর্তা মারধরের ঘটনায় পদাবনতি পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন মিঠু ও মাহমুদ আল জামানের শাস্তি মওকুফ করে দিতে হয় উপাচার্যকে। এতে করে ইতোপূর্বে এক সময়কার উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা রূপ নেয় তীব্র বিরোধ এবং সংশয়–অবিশ্বাসে।

রেজিস্ট্রার অপসারণের পর উপাচার্যের কাছে নতুন করে কিছু দাবি জানায় উপ-উপাচার্য গ্রুপ। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— স্থগিতাদেশ দেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়োন্নয়ন প্রদান, শিক্ষক সাইফুলের পদোন্নতি, অধ্যাপক জামালের স্ত্রীর চাকরি এবং বেশ কিছু অ্যাডহক নিয়োগ। দাবিগুলো পূরণে উপাচার্যকে এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। আল্টিমেটাম পূরণ না হলে উপাচার্যের বাসভবনে তালা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পাশাপাশি উপাচার্যের বাসভবনের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দেওয়া হয়।

এই ঘটনার মধ্যেই ৫ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহানের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। উপ-উপাচার্য ডিন ড. দেলোয়ারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা উপকরণের বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন। এতে করে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে উপ-উপাচার্য গ্রুপ। পরিস্থিতি আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও ডিনের মধ্যে মধ্যস্থতার বিষয়ে আশ্বাস দেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই বরিশালে উপাচার্যের নিজ বাসভবনে তিনি উপ-উপাচার্যের গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতায় বসেন। সেখানে উপাচার্য ড. দেলোয়ারকে ডিন পদ থেকে অপসারণের দাবিসহ তাদের বেশ কিছু দাবি মেনেও নেন।

৭ জানুয়ারি (বুধবার) সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ক্যাম্পাসে আসেন। দীর্ঘ আলোচনায় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের মধ্যকার মধ্যস্থতায় অধ্যাপক ড. দেলোয়ারকে ডিন হিসেবে স্বপদে বহালের সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে আলতাফ হোসেন ও উপাচার্য দুজনই ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেদিনই রেজিস্ট্রার ড. হাবিবুর রহমানের স্বাক্ষরে ড. দেলোয়ারকে ডিন পদ থেকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে অধ্যাপক জহুরুল হককে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। এতে করে ক্যাম্পাস পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. হেমায়েত জাহান বলেন, ‘বর্তমান উপাচার্য বিএনপির কেউ না, জামায়াতেরও কেউ না। সুতরাং ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তাঁকে আর এই ক্যাম্পাসে থাকার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। এই চেয়ারে বসে তাঁর মিথ্যাবাদিতার ফল এসব। সে আমাকে ভিলেন বানিয়েছে সবার কাছে। কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, পর্যোন্নয়ন নাকি আমি দিইনি— এমন কথা তিনি বলে বেড়িয়েছেন। একের বিরুদ্ধে অন্যকে খেপিয়ে তুলেছেন।’

অধ্যাপক হেমায়েত আরও বলেন, ‘আমরা সন্দেহ করি, রিজেন্ট বোর্ডে বাইরের সদস্যরা আগেই প্রি-মিটিং করে সব ঠিক করে রেখেছিলেন। এখানে যারা প্রাপ্য ছিল, তারা তা পায়নি। সিলেকশন বোর্ড যখন কাউকে সুপারিশ করে, রিজেন্ট বোর্ড সেই সুপারিশ অগ্রাহ্য করতে পারে না। এসব বেআইনি কার্যক্রমে রেজিস্ট্রার যুক্ত ছিলেন, তাই আমরা তাঁরও পদত্যাগ করিয়েছি।’

কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘কৃষি অনুষদের শিক্ষা উপকরণের টাকা (প্রায় ৯০ লাখ) থেকে ড. দেলোয়ার বরাদ্দের ৫৫ শতাংশের বেশি অংশ কেটে রেখেছেন। ভ্যাট ট্যাক্স সর্বোচ্চ ২০–২২ শতাংশ কাটা যেতে পারে। কিন্তু এখানে অর্থের হিসাবে গড়মিল পেয়েছি। পাশাপাশি তাঁর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণেও আমরা তাঁর পদত্যাগ চেয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আলতাফ চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থার বিষয়ে মধ্যস্থতা করতে এসেছিলেন। তিনি নির্বাচনী সময়ে কাউকে রদবদল না করার পরামর্শ দেন। কিন্তু অন্যান্য শিক্ষকরা বাইরের কারও পরামর্শে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত আসুক— তা চাননি। তাই তাঁকে ডিন পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভ্যাট ও ট্যাক্স সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাটা হয়েছে। এটি অ্যাকাউন্টস শাখা কেটে রাখে, এতে ডিনের কোনো হাত নেই। তাই এই অর্থ কাটার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অন্যায্য দাবিসমূহ পূরণের জন্য আমাকে উপ-উপাচার্যের পক্ষ থেকে জিম্মি করে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। দাবি না মানলে উপাচার্যের বাসভবনে তালা দেওয়া, গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা, বাসার নিরাপত্তাকর্মীদের হুমকি দেওয়া, গ্যাস–বিদ্যুৎ–পানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।’

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাছাই বোর্ডের সুপারিশের পর অপর আরেকটি কমিটির প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যায়োন্নয়নের তালিকার সারসংক্ষেপ (সিএস) দেওয়া হয়, যেখানে দুজন কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। বোর্ডের সাক্ষাৎকার শুরুর কয়েক দিন পর কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর শিক্ষাগত সনদের বৈধতা, অর্গানোগ্রাম, পুনঃনিয়োগ ও মেয়াদসংক্রান্ত বিভিন্ন অসামঞ্জস্যতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। এমনকি দুদক ক্যাম্পাসে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ অবস্থায় যাচাই-বাছাই ছাড়া পর্যায়োন্নয়ন দেওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। পরে একটি উচ্চতর কমিটি গঠন করে পূর্বের রেকর্ড যাচাই করা হয়। যাদের ক্ষেত্রে সমস্যা পাওয়া গেছে, তাদের পর্যায়োন্নয়ন দেওয়া হয়নি এবং রিজেন্ট বোর্ডও সেটি সমর্থন দিয়েছে।’

মুশতাক আহমেদ/এসএসকে/

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর