রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ আবারও ‘বিপজ্জনক’ মাত্রা অতিক্রম করেছে। গতকাল সকালে ঢাকার বায়ুমান সূচক (একিউআই) ২২৫ রেকর্ড করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। বিশেষ করে রাস্তায় কর্মরত রিকশাচালক, মোটরবাইক রাইডার এবং বাসের হেলপারদের জীবন এই বিষাক্ত বাতাসে বিষিয়ে উঠেছে।
কায়িক পরিশ্রমের কারণে রিকশাচালকরা দ্রুত শ্বাস নেন, ফলে তারা সাধারণ পথচারীর তুলনায় ১০ গুণ বেশি ধূলিকণা ফুসফুসে গ্রহণ করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় যানজটে দাঁড়িয়ে থাকায় অধিকাংশ চালক বুক ব্যথা ও দীর্ঘস্থায়ী কাশিতে ভুগছেন। রাইড শেয়ারিং অ্যাপের বাইকাররা সরাসরি গাড়ির সাইলেন্সারের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকায় তাদের মধ্যে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়েছে। ধুলার কারণে অনেকের দৃষ্টিশক্তিও ঝাপসা হয়ে আসছে। বাসের হেলপাররা সারা দিন ধুলার মধ্যে দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকায় তাদের ফুসফুসে কার্বন ও সিসার আস্তরণ জমছে। চিকিৎসকদের মতে, এই পেশার মানুষেরা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ৪০% দায়ী রাস্তার ধুলা এবং ৩০% দায়ী ফিটনেসবিহীন পুরনো বাস-ট্রাক। শীতকালীন শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার প্রায় ৪৬% প্রান্তিক শ্রমিক শ্বাসতন্ত্রের কোনো না কোনো জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হচ্ছেন।
এছাড়া রাস্তাটি একের পর এক গর্ত ও নানা প্রতিবন্ধকতায় পূর্ণ। সেখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ মাঝপথে বন্ধ হওয়ায় কয়েক মাস ধরে এলাকাটি এমন অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। এ যেন শ্বাসকষ্টের জন্য দায়ী ধুলামাখা বাতাসের এক খোলা চেম্বার।
আব্বাস আলী বলেন, এই মাসে আমাকে সর্দি-কাশির জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয়েছিল। তবে কাশি এখনো যাচ্ছে না।
কুড়িগ্রামের আব্বাস প্রায় ৪০ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন। সময়ের সাথে সাথে ঢাকার বায়ুদূষণ আরও প্রকট হয়েছে এবং সমস্যাটি তার জীবনের একটি অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। ধুলাবালিযুক্ত বাতাস আমাকে প্রতিদিন সহ্য করতে হচ্ছে। তাই আমি এটা নিয়ে চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছি।
এদিকে আরেক রিকশাচালক তাইজুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, তিনি বায়ুদূষণ সম্পর্কে ভালো করে জানেনই না। তবে তিনি বাতাসে ধুলাবালি যুক্ত হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে অনুভব করেন। তাইজুল বলেন, মাঝে মাঝে দিনের শেষে আমার বেশ কাশি হয়।
ঢাকার বাতাসের মান গত ৯ ডিসেম্বর রাত ১০টায় একিউআই সূচকে ৪৫৭-এ পৌঁছায়। রাত ৮টা থেকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ৪০০-এর উপরে ছিল।
ঢাকার বাসিন্দারা আরও বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ওঠেন যখন দীর্ঘস্থায়ী হাঁপানিতে ভুগতে থাকা একজন তরুণ ডাক্তার তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস প্রদানের পরপরই মারা যান। এটা শুধু ধুলাবালি কিংবা নির্মাণসামগ্রীর মতো উপাদান বলে মনে হয় না। অবশ্যই নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাতাসে কিছু বিষাক্ত গ্যাস রয়েছে। আমরা এতটাই নির্বোধ যে, শহরের কেউই সেটি বুঝতে পারছি না।
যদিও নির্মাণকাজ হ্রাস পেলে কিছুটা স্বস্তি আসবে বলে অনেকে মনে করেছিল। তবে ডিসেম্বরজুড়ে ঢাকার বাতাসের মান অস্বাস্থ্যকরই ছিল। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
ঢাকার সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফিয়ারিক পলিউশন স্টাডিজের পরিবেশ বিজ্ঞানী আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, নভেম্বর মাসে ঢাকায় বায়ুদূষণ ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিসেম্বরের প্রথম ২৫ দিনের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ ঘণ্টার জন্য বাতাসের মানের মাত্রা ৭০০-৮০০ এ পৌঁছেছে।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে মগবাজারে বাসের হেলপার গোলাম মোস্তফার সাথে কথা হয়। বাসের দরজায় ঝুলে থাকা অবস্থায় তার চারপাশে ধুলা উড়ছিল। তিনি একটি মাস্ক পরেছিলেন। মোস্তফা বলেন, আমি পুরো শীতে সর্দি-কাশিতে ভুগছি। আমার বুকে ব্যথা হয়।
কবির হোসেন নামে এক বাসচালক জানান, ঢাকায় ধুলাবালির মাত্রা বাড়ছে। তিনি বলেন, শহরের বিভিন্ন অংশে রাস্তা খনন চলছে। কয়েক মাস আগে শুরু হওয়া অনেক প্রকল্প অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার রুমানুল হাসান একজন বাইকচালক। দূষণের কারণে একই ধরনের স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কথা তিনি জানিয়েছেন। রুমানুল বলেন, রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডগুলো খুবই ধুলাময়। আমরা আগে সিটি করপোরেশনকে রাস্তায় পানি ছিটাতে দেখতাম। কিন্তু এবার তা হয়নি। আর ঢাকা খুবই নোংরা শহর; যেখানে সর্বত্র বর্জ্য ফেলা হয়।
ঢাকায় দূষণের বিপজ্জনক মাত্রার কারণে বাসিন্দারা, বিশেষ করে পরিবহন শ্রমিকরা ক্রমাগত কার্সিনোজেনিক দূষণের সংস্পর্শে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে পিএম১, পিএম২.৫ এবং পিএম১০ (বিভিন্ন আকারের কণা পদার্থ)। পাশাপাশি বেনজিন ও ফর্মালডিহাইডের মতো উদ্বায়ী জৈব যৌগও রয়েছে। জানুয়ারিতে ‘রেস্ট অফ ওয়ার্ল্ড’ নামের একটি গ্লোবাল টেক প্রকাশনা ঢাকায় অ্যাটমোটিউব প্রো মনিটর দিয়ে পিএম১, পিএম২.৫ এবং পিএম১০ এর মাত্রা পরিমাপের জন্য সজ্জিত করা হয়। দিল্লি ও লাহোরেও শ্রমিকদের জন্য অনুরূপ ডিভাইস সরবরাহ করা হয়েছিল।
রিপোর্টে দেখা যায়, তিনজন শ্রমিকই নিয়মিতভাবে দূষণের বিপজ্জনক মাত্রার সংস্পর্শে এসেছে। পিএম২.৫-এর সাথে সংশ্লিষ্ট আড়াই মাইক্রোমিটার ব্যাস বা তার চেয়ে ছোট কণা, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির সাথে সংশ্লিষ্ট। এক্ষেত্রে সকল রাইডাররা ক্রমাগতভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত দৈনিক গড় প্রতি ঘনমিটার ১৫ মাইক্রোগ্রামের ১০ গুণের বেশি এক্সপোজার মাত্রা রেকর্ড করেছে।
আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ২০২০ সালে ঢাকার রিকশাচালকদের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব সম্পর্কে একটি কেস স্টাডি প্রকাশ করেন। গবেষণায় ৩৫ জন অধূমপায়ী রিকশাচালককে নেওয়া হয়; যাদের শ্বাসকষ্টের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এক্ষেত্রে তাদের ফুসফুসের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়েছে।
রিপোর্ট তুলে ধরে কামরুজ্জামান বলেন, ঢাকায় আসার পর থেকে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগেরই বিভিন্ন মৌসুমি ও সিজনাল ব্যাধি ছিল। ৪৬ ভাগের শীতকালে চোখে জ্বালাপোড়া, জ্বর ও কাশি ছিল। যা তাদের রিকশা চালানোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পরিবহন খাতের দূষণ বৃদ্ধির কারণে এই শীতে দূষণ না কমে বরং বেড়েছে। ইজিবাইক ব্যাটারিচালিত হলেও এটি যানজট বাড়ায়, যা দূষণের সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে যানবাহনের দূষণ কমাতে কার্বন কর চালু করা হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যারা দায়ী তাদের মোকাবিলা করতেই ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ঢাকার উপকণ্ঠে রয়েছে ১,২৫২টিরও বেশি ইটভাটা, যা শহরের বায়ুদূষণের ৫৮ ভাগের জন্য দায়ী।
কামরুজ্জামান মনে করেন, দূষণ নিয়ে উৎসভিত্তিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এদিকে রাস্তায় ধুলা কমাতে গত সপ্তাহের শেষের দিক থেকে পানি ছিটানো হচ্ছে; তবে তা অপর্যাপ্ত ছিল।
এছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদে সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল ও বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করার কথা বলেন কামরুজ্জামান। একই সাথে শহরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে প্রথাগত ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে সরে আসার পরামর্শ দেন তিনি। কেননা তা বায়ুদূষণ বাড়ায়।
কামরুজ্জামান বলেন, বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে অগ্রসর হওয়া এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি বিদ্যুৎ অবশ্যই কয়লার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসতে হবে। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশনকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ভস্মীকরণযন্ত্র বসাতে হবে। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে মানুষ নির্বিচারে বর্জ্য পোড়াতে থাকবে।
এদিকে কামরুজ্জামান নির্মাণ প্রকল্পের দীর্ঘ সময়সীমার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বলেছেন। একই সঙ্গে ঢাকায় নববর্ষ উদযাপনকে ঘিরে বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়তে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এ অবস্থায় পরিবেশবিদরা বলছেন, মাস্ক পরা এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং জীবন বাঁচানোর হাতিয়ার। এখনই ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ এবং নিয়মিত রাস্তায় পানি ছিটানো না হলে এই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের শিকার হতে পারে।
বিকেপি/এমএইচএস

