বিএনপিকে ভোট দেওয়ার অপরাধে তালাক দেওয়া গৃহবধূর খোঁজ নিলেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ
ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৫৯
ফেনীতে স্বামীর নিষেধ অমান্য করে ভোট দেওয়ার অপরাধে তালাক দেওয়া গৃহবধূ বিবি জহুরাকে নিয়ে হৈ চৈ চলছে। নানান মানুষ ও মতের যাতাকলে পড়ে সংসার পুনঃস্থাপন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর বাঁশতলা এলাকার ওই বাড়িতে রাজনৈতিক ও সামাজিক মানুষের ভীড়ে পরিস্থিতি কিছুটা ঘোলাটে হয়ে উঠেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার জহুরাকে তালাক দেয় ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন কাওসার।
এদিকে ঘটনার পর জনতার তোপের মুখে পালিয়ে গেলেও শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বাড়িতে আসে কাওসার। এ সময় স্থানীয় লোকজনের চাপের মুখে নিজের ভুল স্বীকার করেন। সবার সাথে আলোচনা করে জানান, একজন মুফতির পরামর্শ নিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ফের সংসার করতে চান। যদিও ঘটনার পর থেকে জহুরা তার শাশুড়ি ও তিন সন্তান নিয়ে শশুরের ঘরেই অবস্থান করছেন।
এদিকে শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জহুরার সাথে দেখা করতে যান বিএনপি নেতৃবৃন্দ। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মশিউর রহমান বিপ্লব, ফেনী পৌর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঁঞা, ধর্মপুর ইউনিয়ন সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে জহুরা, তার শাশুড়ি ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলেন।
এ সময় বিপ্লব জানান, বিএনপি জহুরার বিপদে পাশে আছে। তার সংসার পুনঃস্থাপন, পরিচালনা ও সন্তানদের ভরণ পোষণেও বিএনপি পাশে থাকবে। এ ছাড়া ফেনী জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুস ছাত্তার জানান, জহুরাকে সব ধরনের আইনি ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া হবে।
জহুরা জানান, জীবনের প্রথম ভোট তাও আবার ধানের শীষে প্রয়োগ করেন। এ কারণে তাকে মৌখিকভাবে তালাক দেওয়া হয়। তিনি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সমাধানের মাধ্যমে কাওসারের সংসারেই আমৃত্যু কাটাতে চান। আর কাওসারের মা শরীফা খাতুন জানান, তার ছেলে যে অপরাধ করেছে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে। কাওসারের ঘরে ফিরতে হলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়েই বসবাস করতে হবে। জহুরাকে স্ত্রীর মর্যদা না দিলে কাওসারকে আর পিতার ঘরে জায়গা দেওয়া হবে না বলেও জানান তার মা।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বামীর নিষেধ অমান্য করে ভোট দিতে যাওয়ায় জহুরাকে তালাক দেন তার স্বামী কাওসার। এ খবরে স্থানীয় লোকজন কাওসারকে মারধর করে আটক রাখে। স্ত্রীকে দেওয়া মৌখিক তালাক ফিরিয়ে নেবে এমন কথা বলে কৌশলে পালিয়ে যায় সে। কাওসার ওই এলাকার মৃত ইউসূফ হাজারীর ছেলে। তিন সন্তান নিয়ে জহুরা পড়েছেন অনিশ্চয়তায়।
এলাকাবাসী জানান, বুধবার বিকেলে জহুরাকে ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য বলেন তার স্বামী কাওসার। কিন্তু জহুরা প্রথমবার ভোটার হওয়ায় উৎসাহের সাথে তিন সন্তানকে নিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন সকাল সাড়ে ৯টায়। তখন কাওসার ঘুমে ছিলেন। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির পাশের রাস্তায় গিয়ে কারও থেকে জানতে পারেন তার স্ত্রী ভোট দিতে কেন্দ্রে গেছেন। এ খবর শুনে মাগরিবের সময় স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন ভোটের বিষয়ে। জহুরা তার জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার কথা জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাড়ির পাশের রাস্তায় জহুরাকে মৌখিক তিন তালাক দেন কাওসার। এ সময় স্ত্রীকে তার ঘরে যেতে বারণ করেন।
২০১৩ সালে ফেনী সদর উপজেলার মধুয়াবাজার এলাকার নুর আহম্মদের মেয়ে বিবি জহুরার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কাওসার। এর মধ্যে তাদের সংসারে আবদুল আলিম শুভ (১২), সাবিনা আফরিস ইভানা (৮), ইসরাত জাহান ইসমাত (৪) নামে তিন সন্তান জন্ম নেয়।
নুরুল আফছার নামের এক প্রতিবেশি জানান, বিয়ের পর থেকেই জহুরাকে সবসময় মারধর করতেন কাওসার। এ নিয়ে কয়েকবার সামাজিকভাবে বিচারও হয়। আলী আহম্মদ নামে আরেকজন জানান, শশুরকেও মারধর করেন কয়েকবার।
মোহাম্মদ আজাদ নামের স্থানীয় এক সালিশদার জানান, কয়েকবার বিচারে তিনি উপস্থিত ছিলেন। কাওসারকে উগ্র উল্লেখ করে তিনি জানান, আওয়ামী লীগের সময়ে সে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে মানুষকে জিম্মি করত।
পিতার পরিবার অসচ্ছল হওয়ায় সন্তানদের কথা বিবেচনা করে স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। কাওসার ফেনী শহরের রেলগেট এলাকায় বেডিং কারিগর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সে গৃহবন্দির মতো থাকত।
এম. এমরান পাটোয়ারী/এসএসকে/

