‘তলাবুল ইলমি ফারীদাতুন আলা কুল্লি মুসলিম’, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুরুত্বপূর্ণ এই হাদীসটির সাথে আমাদের প্রায় সবারই পরিচিতি রয়েছে। দ্বীনের ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা যে ফরজ সেটা রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এই বাণীর মাধ্যমে ব্যক্ত করে গেছেন। শরীয়তের মৌলিক ইলম অর্জন ব্যতিত শরীয়তের মৌলিক আহকাম ও আমলগুলো যথাযথভাবে পালন করা কখনো সম্ভব নয়। কারণ, কোনো কাজ বা আমল সুচারুরূপে পালন করার জন্য আগে সে কাজ বা আমলটা সম্পর্কে ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি। জ্ঞান ছাড়া কেবল আন্দাজ বা অনুমানের ভিত্তিতে কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায় না। আর সেটা যদি হয় শরীয়ত পালনের ক্ষেত্রে তাহলে তো মোটেও সম্ভব নয়। এজন্য রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীন পালনের আগে দ্বীনী ইলম শিক্ষা করাটা ফরজ করে দিয়েছেন তাঁর উম্মতের জন্য।
আমাদের দেশে দ্বীনী ইলম শিক্ষায় দুই ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এক- মাদরাসা, দুই- মক্তব। এদেশের মুসলিম শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদেরকে দ্বীনী ইলম শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মাদরাসা এবং মক্তব উভয়টা শত শত বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাদরাসার চেয়ে মক্তব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কারণ, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদেরকে মাদরাসায় না পড়ালেও দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান শেখাতে মক্তবে বাধ্যতামূলক পড়িয়ে থাকে। সন্তান স্কুলে পড়লেও, ঈমানী দায়িত্ব হিসেবে সকালে ভোরবেলায় তার সন্তানকে কোরআন এবং শরীয়তের মাসআলা-মাসায়েল শেখার জন্য আগে মক্তবেই পাঠিয়ে থাকে।
আর আমাদের দেশে দ্বীনী ইলম শিক্ষাদানে মাদরাসার নিজস্ব অবকাঠামো এবং নির্মিত ভবন থাকলেও অধিকাংশ মক্তবের শিক্ষাটা দেওয়া হয় মসজিদের ভেতরে কিংবা বারান্দায়। যেটাকে মসজিদ কেন্দ্রীক মক্তব বলা হয়। শত শত বছর ধরে এই মসজিদগুলোর বারান্দাতে ভোরবেলায় ইমাম সাহেব মুসলিম শিশু-কিশোরদেরকে দ্বীনী গণ ইলম শিক্ষা দিয়ে এসেছে কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ মসজিদগুলো থেকে মক্তবি ইলম শিক্ষাটা হারিয়ে যাচ্ছে নানান কারণে-অকারণে। মসজিদকে সদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার অজুহাত দিয়ে আজকাল মসজিদ কমিটির সদস্যরা মসজিদ থেকে মক্তবের শিক্ষাটা উঠিয়ে দিয়েছে। বন্ধ করে দিয়েছে মসজিদের ভেতরে দ্বীনী ইলম শিক্ষাদানের কার্যক্রম।
ওদিকে অধিকাংশ মসজিদের ফান্ড অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ না হওয়ায় মসজিদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ মসজিদের পাশে আলাদাভাবে মক্তব নির্মাণেও এগিয়ে আসছে না। এমনকি, দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ মসজিদের সার্বিক উন্নতিতে সদা সজাগ থাকলেও মক্তব পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা একেবারেই উদাসীন। অথচ দ্বীন রক্ষায় মসজিদ এবং মক্তব উভয়টার গুরুত্ব অপরিসীম। কোনোটা থেকে কোনোটাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান নামাজ পালনের জন্য যেমন মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম ঠিক তেমনিভাবে শরীয়তের মৌলিক ইলম শিক্ষাদানের জন্যও মক্তবের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু আমরা মসজিদের গুরুত্ব বুঝলেও, বুঝছি না ইলম শিক্ষা এবং মক্তবের গুরুত্বটুকু। যার ফলে, গ্রামের শিশু-কিশোররা দ্বীনী ইলম শেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অভিভাবক এবং শিশু-কিশোরদের নিকট দিনদিন গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান এবং কোরআনুল কারীম শেখার গুরুত্বটা। আর এভাবে যদি শিশু-কিশোররা মক্তবে গিয়ে দ্বীনের মৌলিক ইলম অর্জন করা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে এবং এটাকে গুরুত্বহীন ভাবতে শুরু করে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সমাজে ধর্মহীন এবং দ্বীনী ইলম শিক্ষাহীন একটা প্রজন্ম গড়ে ওঠবে। ফলে তাদের দ্বীনী শিক্ষা না থাকায় নাস্তিকতার দিকে ধাবিত হওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতা থেকে বাঁচাতে এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতে বিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে এদেশের প্রতিটি মসজিদকে সকালবেলার মক্তবে পরিণত করতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী: অনার্স চতুর্থ বর্ষ, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

