যুক্তরাষ্ট্রের আইনজীবীরা এ কারাগারকে ‘নরকের মতো’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি কিছু বিচারকও সেখানে দণ্ডপ্রাপ্তদের পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এটি ব্রুকলিনের সেই কুখ্যাত কারাগার মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার বা এমডিসি। যেখানে রাখা হয়েছে ভেনেজুয়েলা থেকে জোরপূর্বক আটক দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। খবর বিবিসি’র।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে।
যা ছিলো দক্ষিণ আমেরিকায় সাম্প্রতিক দশকগুলোর অন্যতম নজিরবিহীন সামরিক অভিযান।
আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, মাদুরোকে প্রথমে আকাশপথে ইউএসএস ইয়ু জিমা জাহাজে, এরপর কিউবার গুয়ানতানামো নৌঘাঁটিতে এবং সব শেষে আরেকটি বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নেওয়া হয়।
“তোমরা তো শুভরাত্রীকে ‘বুয়েনাস নোচেস’ বলো, তাই না? গুড নাইট! হ্যাপি নিউ ইয়ার!” বিগ অ্যাপল অর্থাৎ নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর প্রথম দিকের এক ভিডিওতে এমনটাই বলতে শোনা যায় মাদুরোকে।
ভিডিওতে তাকে হাতকড়া পরা অবস্থায়, দুইজন মাদকবিরোধী এজেন্টের পাহারায় হাঁটতে দেখা যায়।
তার পরনে ছিল স্পোর্টস জ্যাকেট, মাথায় কালো টুপি, আর পায়ে মোজা পরা স্যান্ডেল।
হুগো চ্যাভেজের উত্তরসূরি মাদুরোকে প্রথমে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) এর সদরদপ্তরে নেওয়া হয়। এরপর তাকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার (এমডিসি) এর একটি কক্ষে রাখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় আওতায় মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মাদক পাচার ও নার্কো-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের বিচার চলাকালে তাকে ওই আটককেন্দ্রেই রাখা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও একই আটককেন্দ্রে বন্দি করা হয়েছে।
এ কারাগারটি দেখতে কেমন এবং এ আটককেন্দ্রে আগে আর কোন কোন পরিচিত মুখ বন্দি ছিলেন?
একটি উল্লম্ব কারাগার
মাদুরোকে যে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) রাখা হয়েছে, সেটি কংক্রিট ও স্টিলের তৈরি একটি বিশাল বহুতল ভবন।
এর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে, নিউইয়র্কের সমুদ্র বন্দর থেকে কয়েক মিটার দূরে এবং ফিফথ অ্যাভিনিউ, সেন্ট্রাল পার্কসহ শহরের অন্যান্য পরিচিত স্থাপনা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে।
নিউইয়র্ক শহরের দীর্ঘদিনের কারাগার সংকট ও অতিরিক্ত বন্দির চাপ মোকাবিলার জন্য ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে এ কারাগারটি চালু করা হয়েছিল।
এটি এমন একটি জায়গায় নির্মিত, যেখানে আগে সমুদ্রবন্দরের টার্মিনালে নোঙর করা জাহাজ থেকে আসা বা যাত্রা করা পণ্য রাখা ও পরিবহনের স্থাপনা ছিল।
ফেডারেল ব্যুরো অব প্রিজনস (বিওপি)এর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনের আদালতে বিচারাধীন নারী ও পুরুষ আসামিদের রাখাই ছিল এ কারাগারের মূল উদ্দেশ্য।
তবে স্বল্পমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদেরও এখানে রাখা হয়।
বর্তমানে নিউইয়র্কে বিওপি পরিচালিত একমাত্র কারাগার এটি। ২০২১ সালে সংস্থাটি ম্যানহাটনে পরিচালিত অনুরূপ একটি কারাগার বন্ধ করে দেয়।
এর পেছনে কারণ ছিল ২০১৯ সালের একটি আত্মহত্যার ঘটনা।
মার্কিন ব্যবসায়ী জেফ্রি এপস্টেইন ওই বন্দিশিবিরের বিতর্কিত পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা করেন। তার বিরুদ্ধে যৌনকর্মী পাচার ও পতিতাবৃত্তির অভিযোগে ছিলো।
কারাগারটি প্রসিকিউটরের দপ্তর সেইসাথে দুটি ফেডারেল আদালতের মাঝখানে অবস্থিত এবং ভেতরে সংযুক্ত করিডোর রয়েছে, যার মাধ্যমে আসামিদের জনসম্মুখে আনা ছাড়াই আদালতে আনা-নেওয়া করা যায়।
পুরো কমপ্লেক্সটি ইস্পাতের ব্যারিকেডে ঘেরা এবং দূর থেকেও ছবি তুলতে সক্ষম এমন ক্যামেরায় সজ্জিত।
সাম্প্রতিক সময়ে এই বন্দিশিবিরের বাইরের নিরাপত্তা আরো জোরদার করা হয়েছে।
উল্লম্ব নকশার হলেও, এ কেন্দ্রে খোলা জায়গায় খেলাধুলার ব্যবস্থা, চিকিৎসা ইউনিট এমনকি একটি লাইব্রেরিও রয়েছে, এমনটাই জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক-পিবিএস।
যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই, তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দাবি, এখানকার সেলগুলো মাত্র কয়েক মিটার লম্বা এবং বন্দিরা বেশির ভাগ সময়ই এসব সেলের ভেতরেই সময় কাটান।
‘নরকের মতো অবস্থা’
ভেনেজুয়েলার আটককেন্দ্রসহ লাতিন আমেরিকার অনেক কারাগারে যে সমস্যাগুলো দেখা যায় যেমন : অতিরিক্ত বন্দি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সহিংসতা, সেগুলো ব্রুকলিনের এমডিসিতেও খুবই সাধারণ ব্যাপার।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক হাজার বন্দি রাখার জন্য নির্মিত এই কারাগারে ২০১৯ সালে প্রায় ১৬০০ বন্দিকে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে এখানে এক হাজার ৩৩৬ জন বন্দি রয়েছে বলে জানিয়েছে ফেডারেল ব্যুরো অব প্রিজনস (বিওপি)।
এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে কারাগারটি মাত্র ৫৫ শতাংশ জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আদালতের নথি উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানায় এপি নিউজ এজেন্সি।
অতিরিক্ত বন্দি ও জনবলের ঘাটতির এ যুগল সংকটই কারাগারের ভেতরে নিয়মিত সংঘর্ষ ও সহিংস ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়।
এত কিছুর পরও সমস্যা এখানেই শেষ নয়। ভবনটির ভৌত অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।
এর প্রমাণ মেলে ২০১৯ সালে, যখন একটি বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে শীতের মাঝামাঝি সময়ে কয়েক দিন ধরে বন্দিরা ঘর গরম করার ব্যবস্থা ছাড়াই থাকতে বাধ্য হন।
‘এমডিসির পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য ও অমানবিক,’ সে সময় নিউইয়র্কের তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস মন্তব্য করেন।
এ জরাজীর্ণ অবস্থার জন্য তিনি ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে মামলাও করেন।
‘কারাবন্দি হওয়ার অর্থ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়,’ তিনি আরও বলেন।
এদিকে, আইনজীবী এডউইন করদেরোর মতো অনেকে এই কারাগারকে ‘পৃথিবীতেই নরকের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুনে করদেরোর এক মক্কেল ইউরিয়েল হোয়াইট অন্য বন্দিদের হাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন।
এ মতের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন নিউইয়র্ক ফেডারেল ডিফেন্ডার্সের সাবেক পরিচালক ডেভিড প্যাটন।
তিনি এক স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, কারাগারটি নানা সমস্যায় জর্জরিত ‘চিকিৎসা সেবার অভাব থেকে শুরু করে গুরুতর স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন, খাবারে কৃমির উপস্থিতি এবং কয়েদিদের মধ্যে সহিংসতাসহ আরো নানা পরিস্থিতির শিকার।’
এ নাজুক পরিস্থিতির কারণেই ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত চারজন বন্দি আত্মহত্যা করেছে বলে মনে করা হয়।
কারাগারের এই অবস্থা নিয়ে বিচারকরাও অসন্তুষ্ট। এর প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়, কিছু বিচারক সেখানে আর দণ্ডপ্রাপ্তদের পাঠাতে চান না।
তাদের একজন ছিলেন বিচারক গ্যারি ব্রাউন। তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে জানান, কর ফাঁকির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত ৭৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে দেওয়া নয় মাসের কারাদণ্ড তিনি বাতিল করে দেবেন, যদি ফেডারেল ব্যুরো অব প্রিজনস (বিওপি) তাকে ব্রুকলিন এমডিসিতে পাঠানো হয়।
তার পরিবর্তে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গৃহবন্দি করে বাড়ি থেকে নজরদারির রায় দেয়ার কথা জানান তিনি।
লন্ডনের পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট এর খবরে বলা হয়েছে, গ্যারি ব্রাউন বলেন, ‘এই ধরনের সংঘাতের ঘটনাগুলো তখনই ঘটে যখন কর্তৃপক্ষ তদারকি করতে চরম ব্যর্থ, এগুলো জনশৃঙ্খলার জন্যও সমস্যা সৃষ্টি করে, কারাগারে এক ধরনের অরাজকতার পরিবেশ তৈরি করে, যা অগ্রহণযোগ্য, নিন্দনীয় এবং প্রাণঘাতী ব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন।’
দুর্নীতির কেলেঙ্কারির কারণেও কারাগারটি বারবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।
২০২৫ সালের ৬ মার্চ বিচার বিভাগ ঘোষণা দেয়, সহিংসতা ও নিষিদ্ধ সামগ্রী পাচারের সঙ্গে জড়িত ১২টি পৃথক মামলায় ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। যাদের মধ্যে বন্দি ও সাবেক কারা কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
অন্যান্য আলোচিত বন্দি
ব্রুকলিনের এই কারাগারের ভয়াবহ অবস্থার কথা জানা থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ এখানেই বহু আলোচিত ও প্রভাবশালী বন্দিকে রেখেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নিকোলাস মাদুরোই প্রথম কোনো লাতিন আমেরিকান রাজনীতিক নন যিনি এই কারাগারে বন্দি হলেন।
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ তিন বছরেরও বেশি সময় ব্রুকলিনের এমডিসি কারাগারে বন্দি ছিলেন।
গত বছরের জুনে ফেডারেল আদালতে মাদক পাচারের দায়ে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার পর তাকে অন্য একটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
বিস্ময়করভাবে, গত ডিসেম্বরে তাকে ক্ষমা করে দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মেক্সিকোর সাবেক জননিরাপত্তা সচিব জেনারো গার্সিয়া লুনাও নিউইয়র্কের এই কারাগারের একটি সেলে কিছু সময় কাটিয়েছেন।
মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদক সম্রাটদের একজন, হোয়াকিন "এল চাপো" গুজমানও এখানে ছিলেন।
আর সিনালোয়া কার্টেলের অন্যতম শীর্ষ নেতা ইসমাইল "এল মায়ো" জামবাডা এখনো এই ভবনেই মাদক পাচারের মামলায় বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এছাড়া সংগঠিত অপরাধ জগতের ঐতিহাসিক চরিত্র জন গট্টি এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর গ্রেপ্তার হওয়া আল-কায়েদার কয়েকজন সদস্যও এই কারাগারে বন্দি ছিলেন।
এমনকি র্যাপার ও সংগীত প্রযোজক শন "ডিডি" কম্বসও কয়েক মাস এমডিসিতে আটক ছিলেন।
এক দশকের বেশি সময় ধরে নারীদের নির্যাতনের অভিযোগে চার বছরের কারাদণ্ড হওয়ার পর তাকে ডিডিকে নিউ জার্সির আরেকটি কারাগারে পাঠানো হয়।
জেফ্রি এপস্টেইনের সহযোগী ও সাবেক সঙ্গী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল, দেউলিয়া হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম এফটিএক্স-এর সাবেক প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ব্যাংকম্যান-ফ্রাইড এবং আর্থিক অপরাধে তিন বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী মাইকেল কোহেন, তারাও এমডিসির অন্যান্য আলোচিত বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন।
এমবি

