Logo

আন্তর্জাতিক

ভারতের যে মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৮

ভারতের যে মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের তদন্তের কাজে বাধা দিয়েছেন বলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এখন একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এবছরের আটই জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস দলের পরামর্শদাতা সংস্থার মালিকের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি চালানোর সময়েই সেখানে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে হাজির হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী।

দুই জায়গা থেকেই তিনি বেশ কিছু ফাইল ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র নিয়ে বেরিয়ে আসেন বলে অভিযোগ করেছে তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি।

মমতা ব্যানার্জী নিজেও সংবাদ মাধ্যমের সামনেই স্বীকার করেছিলেন যে দলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নথি তিনি সরিয়ে এনেছেন।

এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং মূলত অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলার তদন্ত করে থাকে। প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করারও ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তবে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো একজন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এভাবে তদন্তে বাধা দানের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়েই দেখছে সুপ্রিম কোর্ট।

তবে এর আগে বিভিন্ন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সি তদন্ত করে গ্রেপ্তার করেছে।

গ্রেপ্তারের ঠিক আগে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে উঠেছেন, এই ঘটনাও আছে। আবার একাধিক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে জেলেও পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি ইডি বা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো - সিবিআই।

দেখে নেওয়া যাক ভারতের কোন মুখ্যমন্ত্রী বা সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করেছিল কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো এজেন্সি:

অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেফতারির বিরুদ্ধে গারদের ভেতরে তার ছবি নিয়ে দলীয় সমর্থকদের বিক্ষোভ - ফাইল ছবি

দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকা অবস্থাতেই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের হাতে গ্রেপ্তার হন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, পদে থাকাকালীন অবস্থাতেই যাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছিল।

তবে তামিলনাডুর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতাই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, যাকে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনই জেলের সাজা শোনানো হয়।

রায় ঘোষণার পরে আদালত চত্বরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু আইন অনুযায়ী, আদালতের রায়ের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ খুইয়েছিলেন।

সেই দিক থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

দিল্লিতে মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার নীতি বদল করে অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কয়েকজন মন্ত্রী ও নেতা মদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন, এ অভিযোগেরই তদন্ত করছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সিটি।

গ্রেপ্তার করে তাকে তিহাড় জেলে রাখা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই তিনি অনেকদিন সরকার চালিয়েছেন। পরে অবশ্য তাকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছিল।

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়ে বের হচ্ছেন লালু প্রসাদ ইয়াদভ - ২০১৭ সালের ছবি

বিহারের লালু প্রসাদ ইয়াদভ

বিভিন্ন সময়ে যে মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভারতে, তার মধ্যে সব থেকে বেশি আলোচিত যে নামটি, সেটি বিহারের লালু প্রসাদ ইয়াদভের ঘটনা। তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রসাদ ইয়াদভ আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

তার ঠিক আগে প্রসাদ ইয়াদভ অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজ্যের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন স্ত্রী রাবড়ি দেবীর হাতে। এরপরেই পুলিশের গাড়িতে ওঠেন তিনি।

গবাদিপশুর খাদ্য কেনার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। মামলাটির নাম ‘চারা ঘোটালা’ –যার মানে ‘পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি’।

মামলাটির তদন্ত করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআই। তদন্তকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন সিবিআইয়ের এক বাঙালি অফিসার উপেন বিশ্বাস।

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির শুরু ১৯৯০-এর দশকে। সেসময়ে বিহার ভাগ করে ঝাড়খণ্ড রাজ্য তৈরি হয়নি। অবিভক্ত বিহারের বিভিন্ন ট্রেজারি থেকে পশু খাদ্য কেনার ভুয়া বিল দিয়ে সরকারি অর্থ তছরুপ করা হয়েছিল। একাধিক শহরে লালু প্রসাদ ইয়াদভ এবং কয়েকজন আমলার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল সিবিআই।

ওই দুর্নীতি সামনে আসার পরে প্রথমবার প্রসাদ ইয়াদভ গ্রেপ্তার হন ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে। ভারতের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো ঘেঁটে জানা যাচ্ছে যে তিনি ওই পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির বিভিন্ন মামলায় অন্তত ছয়বার জেলে গেছেন, আবার জামিনও পেয়েছেন তিনি।

শেষমেষ ওই দুর্নীতির মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছে একাধিক আদালত। ঘটনাচক্রে একই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বিহারের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রও। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী।

লালু প্রসাদ ইয়াদভ যখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়ে রেলে চাকরি-দুর্নীতির আরেকটি মামলা এখন চলছে তার বিরুদ্ধে। সেই মামলায় এ বছরের নয়ই জানুয়ারি দিল্লির একটি আদালত প্রসাদ ইয়াদভ ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেছে।

তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অনেক আগে, ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে জয়প্রকাশ নারায়ণের ঘনিষ্ঠ ছাত্রনেতা হিসাবে লালু প্রসাদ ইয়াদভের প্রথম জেল যাত্রা। সেটা অবশ্য ছিল রাজনৈতিক গ্রেপ্তার। সেই পর্যায়ে দুবছর জেলে ছিলেন তিনি।

ঝাড়খণ্ডের তিন মুখ্যমন্ত্রী গ্রেপ্তার হন

ঝাড়খণ্ড রাজ্যে জমি বিক্রি ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০২৪ সালে ইডি গ্রেপ্তার করেছিল হেমন্ত সরেনকে। তিনি অবশ্য গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে পদত্যাগ করেন এবং সিনিয়র মন্ত্রী চম্পাই সরেন তার স্থলাভিষিক্ত হন।

জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে চম্পাই সরেন আবারও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন এখন।

আগেও এ রাজ্যের দুজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে প্রথম ছিলেন হেমন্ত সরেনের বাবা শিবু সরেন এবং দ্বিতীয়জন হলেন আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মধু কোড়া।

ঝাড়খণ্ডের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শিবু সরেনকে সিবিআই গ্রেফতার করেছিল একটি খুনের মামলায়। শিবু সরেনেরই ব্যক্তিগত সচিব শশীনাথ ঝাকে ১৯৯৪ সালে অপহরণ করে খুন করার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। গ্রেফতার হওয়ার সময়ে – ২০০৬ সালে, তিনি ছিলেন মনমোহন সিং সরকারের কয়লা মন্ত্রী। গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।

অপহরণ আর খুনের অভিযোগে তার যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা হয়েছিল। তবে পরে দিল্লি হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট – উভয়ই অপহরণ ও খুনের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়।

হেমন্ত সরেনের আগে ঝাড়খণ্ডের যে আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছিলেন, তার নাম মধু কোড়া। অর্থ পাচার ও আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পত্তির অভিযোগে ইডি তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছিল।

ঘুষ নিয়ে কয়লাখনির বরাত পাইয়ে দিতেন – এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয় এবং ২০০৯ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় চার বছর বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন ঝাড়খণ্ডের সব থেকে কম বয়সের মুখ্যমন্ত্রী মি. কোড়া।

পরে ২০১৭ সালে তাকে দোষী বলে ঘোষণা করে আদালত এবং তিন বছরে জেল হয়।

দক্ষিণ থেকে উত্তর – গ্রেপ্তার হন আরও মুখ্যমন্ত্রীরা

দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও পদ থেকে সরে যাওয়ার পরে গ্রেফতার হয়েছেন দুর্নীতির অভিযোগে। এদের মধ্যে সব থেকে হাইপ্রোফাইল ঘটনা ছিল তামিলনাডুর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতার গ্রেফতার।

বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সেই সংবাদ এভাবে লেখা হয়েছিল––

‘ভারতের বর্ণাঢ্য এবং বিতর্কিত রাজনীতিক, তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম জয়ললিতাকে এক বিশেষ আদালত দুর্নীতির দায়ে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে’।

‘সাজা ঘোষণার পরপরই তাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীত্ব আর সংসদ সদস্যপদ হারিয়েছেন জয়ললিতা। আয়ের সাথে সংগতিহীন সম্পদ অর্জনের এক মামলায় ১৮ বছর ধরে বিচার কাজ চলার পর আজ এই রায় হয়। ভারতে এই প্রথম ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রীর জেলের সাজা হলো’।

তামিলনাডুর পড়শি রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। তখন তিনি অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না।

একাধিকবার অবিভক্ত অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মি. নাইডু।

তাকে ৩১৭ কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের একটি দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। তাকে অবশ্য কোনো কেন্দ্রীয় এজেন্সি নয়, ওই রাজ্যের সিআইডি গ্রেফতার করেছিল।

উত্তরাঞ্চলীয় হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওম প্রকাশ চৌতালা এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তার এবং তার ছেলেকে ২০১৩ সালে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টও তাদের সাজা বহাল রেখেছিল।

২০২২ সালে তিনি আবারও আয়ের সঙ্গে সংগতিবিহীন সম্পদ রাখার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন। চার বছরের জেলের সাজা হয়েছিল তার।

পদে থাকা অবস্থায় বা ইস্তফা দেওয়ার অব্যবহিত পরে কিংবা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতারির বাইরেও পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, মহারাষ্ট্রসহ অনেক রাজ্যের মন্ত্রীদেরও গ্রেফতার করেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো।

তবে তথ্য বলছে, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট হোক বা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো – সিবিআই – দুটি সংস্থার ক্ষেত্রেই আদালতে অপরাধ সাব্যস্ত করার হার খুবই কম। সবসময়েই অভিযোগ ওঠে যে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল তাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোকে কাজে লাগায়। তথ্যসূত্র-বিবিসি 

এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ভারত পশ্চিমবঙ্গ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর