যুক্তরাজ্য-চীনের সম্পর্ক জোরদার, ট্রাম্পকে এড়িয়ে এগোতে চায় স্টারমার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:৩০
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার চীনে সফর করেছেন, যা আট বছর পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার বৈঠকের পর স্টারমার জানান, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে বেইজিংয়ের সঙ্গে ‘পরিশীলিত সম্পর্ক’ গড়ে তুলতে চান। অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব স্থাপনের ওপর জোর দিয়েছেন। এছাড়া দুই নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হন স্টারমার। তারা প্রায় তিন ঘণ্টা একত্রে সময় কাটিয়েছেন। তাদের আলাপ-আলোচনার মধ্যে ফুটবল ও শেক্সপিয়ার প্রসঙ্গও ছিল। সফরে স্টারমার ৫০ জনেরও বেশি ব্যবসায়ী নেতাকে সঙ্গে নিয়েছেন।
স্টারমারের সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় লড়াই করছে। এই সংকট উত্তরণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চীনের মতো সম্পদশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
স্টারমার বৈঠকের শুরুতে চীনের প্রেসিডেন্টকে বলেন, ‘চীন বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। আমাদের মধ্যে একটি পরিশীলিত সম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতার সুযোগগুলো চিহ্নিত করতে পারি। সেজন্য অর্থপূর্ণ সংলাপের সুযোগ তৈরি করা উচিত।’
প্রেসিডেন্ট শি বলেন, ‘চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক অতীতে স্থির ছিল না। কখনো ভালো ও কখনো খারাপ হয়েছে। সম্পর্কের এই ওঠানামা কোনো দেশেরই মঙ্গল করেনি। অতীতের কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব বা ভুল সিদ্ধান্ত লাভজনক হয়নি। আমরা দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রস্তুত। আমরা এমন সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারি, যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
গ্রেট হলে স্টারমারকে স্বাগত জানালেন চীনা প্রধানমন্ত্রী
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপলে স্টারমারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়ান। এ সময় দুই চীনা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর প্রায় ১৪০ সদস্য তাকে গার্ড অব অনার দেয়। এ সময় বেজে ওঠে একটি সামরিক ব্যান্ড।
ট্রাম্প থেকে সাবধানতা চায় দুই দেশ
স্টারমার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত নীতি বা সিদ্ধান্ত থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে চান। ট্রাম্পের ব্যাপারে বিরাগভাজন হয়ে এর আগে কানাডাও চীনের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ট্রাম্পের কূটনৈতিক ঝড়ের শিকার সর্বশেষ পশ্চিমা নেতা স্টারমারও ঝুঁকেছেন চীনের দিকে।
ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্কের হুমকি এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ দখলের প্রচেষ্টা যুক্তরাজ্যের মতো বড় মিত্রদেরও হতাশ করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বাণিজ্য বাধা দূর করার জন্য বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি সই করেছেন। এসব পদক্ষেপে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ। যুক্তরাজ্য ও চীন ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক এড়িয়ে এগোতে চায়।
স্টারমার সাংবাদিকদের জানান, হুইস্কির ওপর শুল্ক কমানোর জন্য বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে শি বলেছেন, চীন ব্রিটিশ নাগরিকদের ভিসা মওকুফ করার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। স্টারমার বলেন, দুদেশের সম্পর্ক একটি শক্তিশালী জায়গায় মিশেছে।
বহির্মুখী বাণিজ্যিক নীতি গুরুত্ব স্টারমারের
স্টারমার চীনের সঙ্গে নতুন যোগাযোগ নীতি গ্রহণ করেছেন। আগের কনজারেভটিভ সরকারগুলো অধীনে বছরের পর বছর চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। লন্ডন জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে কিছু চীনা বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। এছাড়া হংকংয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়নেও উদ্বেগ ছিল লন্ডনের। স্টারমার শি জিনপিংকে বলেন, ‘আমি যুক্তরাজ্যকে বহির্মুখী বাণিজ্যিক নীতিতে পরিচালনা করতে প্রস্তুত।‘
আপনার দৃষ্টি দীর্ঘ দূরত্বে রাখুন- স্টারমারকে শি
শীর্ষ সম্মেলনে শি জিনপিং বলেন, বিশ্বের বর্তমান অবস্থা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এজন্য যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যে আরও সংলাপ অত্যাবশ্যক। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে কিংবা দুই দেশের অর্থনীতি এবং জনগণের জন্য এটা করা উচিত। তিনি বলেন, অতীতে লেবার সরকারগুলো দুদেশের সম্পর্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।
শি বলেন, চীন যুক্তরাজ্যের সাথে দীর্ঘমেয়াদী ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে প্রস্তুত। এটি দুদেশের জনগণের জন্য উপকারী হবে। আমরা যদি পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠতে পারি, তাহলে আমরা ইতিহাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারব।
শি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশ ও জনগণের মৌলিক স্বার্থ ঠিক থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নেতা হিসেবে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। এ সময় তিনি ‘আপনার দৃষ্টি দীর্ঘ দূরত্বে রাখুন’ এই চীনা প্রবাদও উদ্ধৃত করেন। এর মাধ্যমে তিনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিয়েছেন।
চীনে বিনিয়োগের ঘোষণা অ্যাস্ট্রাজেনেকার
যুক্তরাজ্যের ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা ২০৩০ সাল পর্যন্ত চীনে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ ওষুধ উৎপাদন এবং গবেষণা ও উন্নয়ন সম্প্রসারণের জন্য ব্যবহার করা হবে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্টারমার বলেছেন, কোম্পানিটির চীনে সম্প্রসারণ যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে সাহায্য করবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
মানবাধিকারের বিষয়গুলো তুললেন স্টারমার
চীনের বিরুদ্ধে জিনজিয়াংয়ের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উইঘুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চীনের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরেন স্টারমার।
কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর সমালোচক জিমি লাই এবং উইঘুরদের প্রতি আচরণের বিষয়টি স্টারমার কতটা জোরালোভাবে উত্থাপন করেছেন জানতে চান এক সাংবাদিক। এর জবাবে তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়গুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী উত্থাপন করেছি। বিষয়গুলো সম্মানজনকভাবে উত্থাপন করা হয়েছে এবং জিনপিংও তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি ও রয়টার্স
এএস/

