Logo

ইসলাম

ভূমিকম্প আল্লাহর নিদর্শন ও সতর্কবার্তা

Icon

আব্দুস সাত্তার সুমন

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৩:৩৬

ভূমিকম্প আল্লাহর নিদর্শন ও সতর্কবার্তা

মানুষের তৈরি শহর-নগর, উচ্চ-শ্রেণির ভবন, আর প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সবই মানুষকে একটা ‘নিরাপদ ও স্থির’ দুনিয়া ভেবিয়ে রেখেছে। কিন্তু প্রকৃতি বিশেষ করে ভূতাত্ত্বিক গতিশক্তি মানব পরিকল্পনাকে মুহূর্তে উল্টে দিতে পারে। ভূমিকম্প, নি:সন্দেহে, এমনই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ, নদীমাতৃক ও নরম মাটির দেশে ভূমিকম্প শুধু সম্ভাব্য নয়, বরং বাস্তবতাও। তাই শুধু প্রাকৃতিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নয় ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রতিফলন করা জরুরি।

কেন বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ

ভৌগোলিক ও টেকটোনিক ব্যাকগ্রাউন্ড: বাংলাদেশের অবস্থানই এক বড় কারণ। দেশটি এমন অঞ্চলের কাছে, যেখানে সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট এবং ফল্ট লাইন রয়েছে। বিশেষ করে, ডাউকি ফল্ট (শিলং প্লেটোর দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর) এবং মধুপুর ফল্টসহ একাধিক ফল্ট জোন রয়েছে যা ভূমিকম্প সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণা দেখায়, শুধু ফল্ট সীমান্ত নয়, অভ্যন্তরীণভাবে (intra-plate) অনেক সক্রিয় ফল্ট রয়েছে অর্থাৎ, একটি বৃহৎ প্লেট সংঘর্ষ নয়, বরং চাপ ও জমে থাকা শক্তি থেকে মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পও হতে পারে। 

মাটির গঠন ও ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা: বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (এইগ) ডেল্টার ওপর গড়ে উঠেছে যেখানে মাটির স্তর সাধারণত নরম, চুনাপাথর নয়, বরং নতুন ও অনমনীয় বালু, সিল্টি ও কাদা মিশ্রিত sediments। এই ধরনের নরম, জল-সংগৃহীত মাটিতে ভূমিকম্পের time history-†Z (ground motion) site amplification হয় অর্থাৎ, কম্পন বাড়ে, কম্পনের সময় দীর্ঘ হয় এবং মধ্যম থেকে মধ্য-উচ্চ স্তরের ভবনগুলো এই কম্পনের দ্বারা বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। এছাড়া, লিকুইফ্যাকশন 

(liquefaction) অর্থাৎ, জল-সন্তৃপ্ত বালি বা সিল্টি মাটি কম্পনের সময় প্রায় তরলের মত আচরণ করতে পারে ফলে ভবন ট্র্যাপজিক্যালি টিল্ট বা ধসিয়ে যেতে পারে, সড়ক/ব্রিজ/বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। 

পূর্ব ইতিহাস ও সম্ভব ভবিষ্যৎ ঝুঁকি : ইতিহাস দেখায়, এলাকা জুড়ে বহু বড় ও মাঝারি ভূমিকম্প হয়েছে যেমন: ১৯০০-এর আগের ও পরে। সাম্প্রতিককালে হলেও ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর, মাত্র ৫.৪ ম্যাগনিচুড হলেও, মধুপুর ফল্ট এ ভূমিকম্প হয়। তাছাড়া, জরিপ ও মূল্যায়ন দেখায় যদি মাঝারি (গ≈৬.৫–৭) ধরনের ভূমিকম্প আসে, শহরাঞ্চল বিশেষ করে হয়তো ভয়াবহ ফল ভোগ করবে। কিন্তু এই ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি অনেকসময়ই প্রচলিত নয়: নির্মাণ মান, সঠিক নির্মাণ নীতি প্রভৃতি বিষয় অনেক সময় অনুপস্থিত। 

এই সব কারণ মিলিয়ে বাংলাদেশ এক ‘ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ’। শুধু সম্ভাবনা নয় বাস্তব ঝুঁকি।

ইসলামি দৃষ্টিকোণে ভূমিকম্প

কোরআন সতর্কবার্তা ও নিয়ামতের প্রতিফলন: সূরা জিলজাল (সূরা ৯৯) হলো সেই সূরা, যা পৃথিবীর কেঁপে ওঠা, তার ‘পরীক্ষা’ ও ‘দায়বদ্ধতা’-কে তুলে ধরা হয়েছে। ‘যখন পৃথিবী তার ভয়ঙ্কর কম্পন দ্বারা কেঁপে উঠবে। আর পৃথিবী তার সমস্ত বোঝা উর্বর করে দেবে।’ এই আয়াতগুলো প্রাথমিকভাবে দেখায় যে পৃথিবীর কম্পন, দাম্ভিকতা, গোপন মূল্য, লোভ, আধিপত্য, যা মানুষ তার ইচ্ছা মত মাটির নিচে জমা করেছে সবই এক দিনে ‘উন্মোচিত’ হবে। অতঃপর, মানুষ জানতে পারবে যে, তার প্রতিটি কাজ ছোট-বড়, গোপন-পরিচ্ছন্ন তার পিয়াম (কর্মফল) বহন করবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমিকম্প কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং আল্লাহর স্মরণ, দায়বদ্ধতা ও প্রস্তুতির আহ্বান।

হাদিসে কিয়ামতের পূর্ব নিদর্শন ও সতর্কবার্তা

সহীহুল বুখারীতে বর্ণিত এক হাদিসে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে- তাকদীর না হলে কিয়ামত চলে আসবে না, যতক্ষণ না জ্ঞান নেয়া হবে, (ভূমিকম্প) বৃদ্ধি পাবে, সময় দ্রুত যাবে, ফিতনা, হত্যা, ভালো ও বাজে কাজ প্রচুর হবে এবং ধন-দৌলত বৃদ্ধি পাবে।

এই হাদিসে ভূমিকম্পকে কিয়ামতের আগমনীয় নিদর্শনের একটি উপাদান হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, এগুলো একসঙ্গে এসে মানুষকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিছু মুসলিম বক্তা, এই সবকিছুকে ‘আল্লাহর স্মরণ, তাওবা, ইবাদত ও নেক কাজের প্রতি ফিরে আসার’ মঞ্চ হিসেবেও দেখেন।

কেউ যদি প্রশ্ন করে, বিজ্ঞান বলছে টেকটোনিক প্লেট বা ফল্ট ধর্ম কেন যুক্ত করব? তাহলে উত্তর হলো- বিজ্ঞান ও ধর্ম যেন এক সেতুবন্ধন।

ধর্ম উদ্দেশ্য সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতা এবং মানুষকে সতর্ক করে। ভূমিকম্প শুধু মাটির কম্পন নয়; এটা মানুষের মন, সমাজ, মূল্যবোধ ও ঈমানকে কাঁপিয়ে দেওয়া সংকেত। হতে পারে কোনো ব্যক্তি, কোনো সম্প্রদায়, এমনকি জাতি হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব ভুলে গেছি।

ভূমিকম্প প্রতিকারে ইসলামি ও সামাজিক প্রস্তুতি

বাংলাদেশ বা ভূমিকম্পপ্রবণ অন্য দেশে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে শুধু প্রার্থনা বা তাওবার সাথে সাথে আরও কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন।

১. নিরাপদ ও ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণ: স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক বিপদ অনুযায়ী ভূমিকম্প সহনশীল ডিজাইন ও নির্মাণ। নির্মাণের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত (যাতে ভবন ‘সেওয়াই’ করতে পারে) নিশ্চিত করতে হবে। পুরনো বা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর রেট্রোফিট (পুনরায় মজবুত ভিত্তি, সিমেন্ট, ইস্পাত ইত্যাদি) বা প্রয়োজন হলে ধ্বংস করে নতুন, নিরাপদ ভবন তৈরি। সরকারি নীতি ও নিয়ম সবার জন্য বাধ্যতামূলক করে প্রস্তুত করে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা। 

২. সচেতনতা সম্প্রদায়, পরিবার ও সরকার: মানুষকে সচেতন করতে হবে। ভূমিকম্প হলে কী করণীয়; দৌঁড়, খোলা জায়গায় যাওয়া, জরুরি উপকরণ, প্রাথমিক ত্রাণ, শিশুর যত্ন, বৃদ্ধি, করযাচাই প্রভৃতি শিক্ষা। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টারগুলিতে নিয়মিত প্রস্তুতি পরিচালনা। জরুরি সেবা রেসকিউ, মেডিক্যাল, ফায়ার সার্ভিস, দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ প্রস্তুত রাখা। পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন; জলাভূমি, নরম মাটি, পুরনো বস্তি যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোর পুনর্বিন্যাস।

৩. আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও নৈতিক পুনরুজ্জীবন: যেহেতু ভূমিকম্প কেবল প্রাকৃতিক নয়, বরং ‘আল্লাহর বার্তা’ তাই নিজের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ই স্মরণ রাখতে হবে। তাওবা, ইস্তিগফার, সালাত, সদকা নাম মাত্র নয়, ন্যায়, সততা, মানবিকতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। দুর্যোগে সহমর্মিতা, একতা, মানবিক সহায়তা। ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো। সমাজব্যবস্থা, পরিকল্পনায় ন্যায়, পরিবেশ সবকিছুকে সম্মান করা।

‘ভূমিকম্প’ নিঃশব্দ আজান, শিক্ষা ও প্রতিচ্ছবি

ভূমিকম্প যখন হয় মাটি কেঁপে ওঠে, বাড়ি ধ্বসে যায় মানুষ আতঙ্কিত হয়। কিন্তু ইমানদারদের জন্য, এটি নিঃশব্দ আজান, আভিজাত্যহীন, কিন্তু শক্তিশালী আহ্বান। আজ আমাদের পৃথিবী, সমাজ ও জীবন অনেক গহ্বর, গোপনতা, অন্যায় এবং গুনাহে ভর্তি। ভূমিকম্প যেন তাতে নড়েচড়ে বলছে; আচরণ দেখাও। তোমার আত্মা, তোমার বান্দা, যখন থাকবে না নাজায়েজ, তখন কি তোমরা ঈমান ও নেক কাজের মূল্য জানবে?

প্রস্তুতি শুধু বিল্ডিং নয়, ইবাদত, নীতি, হৃদয়, সমাজ সবকিছুতে। অনুশীলন ও বাস্তবায়ন শুধু নির্দিষ্ট প্রভাবিত অঞ্চলের জন্য নয়; সমগ্র দেশ, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য। ভূমিকম্প একটি প্রকৃতিপ্রদান বিরল ঘটনা নয়। বাংলাদেশের মতো ভূতাত্ত্বিকভাবে সংবেদনশীল, মাটির গঠন, ইতিহাস, এবং বর্তমান নগরায়ন-শৈলীর কারণে এটি বাস্তব, প্রায় ঘনঘন সম্ভাব্য। কিন্তু শুধু বিজ্ঞান বা নির্মাণশৈলীই যথেষ্ট নয়।

কুরআন ও হাদিস আমাদের শিখিয়েছে প্রতিটি দুর্যোগ, প্রতিটি কম্পন, প্রতিটি চাপ শুধুই মাটির জন্য নয়; মানুষের আত্মার জন্য। সত্য, ন্যায়, এহসান, ইবাদত, সদকা এগুলোই প্রকৃতি ও মানুষ, এবং মানুষ ও আল্লাহর দিকে সম্পর্ককে সুরক্ষিত রাখে। অতএব আসুন, শুধু ‘ভূমিকম্পের প্রস্তুতি’ নয় মানুষ, সমাজ ও ঈমানের প্রস্তুতি নিই।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বাংলাদেশ 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর