নববর্ষ আসে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে নয়- মানুষের ভেতরের ঘড়িতে একটি নতুন টিক দিয়ে। পুরোনো দিনের ধুলো ঝেড়ে সামনে তাকানোর এই মুহূর্তে শব্দের চেয়ে নীরবতাই বেশি কথা বলে। রাত পেরিয়ে ভোর নামলে যেমন আলো ধীরে ধীরে দেয়ালে লাগে, তেমনি নববর্ষের প্রথম আলো আমাদের মনে ছুঁয়ে দেয় অঙ্গীকারের রেখা- আমি বদলাব্যে, অন্তত একটু হলেও।
এই অঙ্গীকার কোনো স্লোগান নয়। এটি আত্মার সাথে করা একান্ত চুক্তি। গত বছরের ভুলগুলো তালিকাভুক্ত করার চেয়ে সেগুলো থেকে শেখার সাহসটাই বড়। আমরা বলি- এবার আর রাগ নয়, হিংসা নয়, অবহেলা নয়। কিন্তু অঙ্গীকার তখনই অর্থ পায়, যখন দৈনন্দিন ছোট ছোট সিদ্ধান্তে তার ছায়া পড়ে। কাউকে কটু কথা বলার আগে থেমে যাওয়া, সুযোগ থাকলে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, নিজের সুবিধার বাইরে অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া- এসবই নববর্ষের নীরব শপথ।
নববর্ষে অঙ্গীকার মানে কেবল নিজের উন্নতি নয়; সমাজের সাথে নতুন করে যুক্ত হওয়া। যে শহরটাকে আমরা ব্যস্ততার অজুহাতে পাশ কাটিয়ে যাই, সেই শহরের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে চোখ রাখা। যে গ্রামটাকে স্মৃতিতে রেখে শহরে চলে এসেছি, তার জল, তার মাটি, তার মানুষের কাছে দায় স্বীকার করা। আমরা যদি ভালো মানুষ হতে চাই, তবে ভালো সমাজ গড়ার অঙ্গীকারও নিতে হবে।
এই অঙ্গীকারে আছে সময়কে সম্মান করার শিক্ষা। প্রতিদিনের কাজকে শেষ করার শৃঙ্খলা, প্রতিশ্রুতি রক্ষার দৃঢ়তা, কথা ও কাজের ফারাক কমানোর সাধনা। আমরা অনেক সময় বড় স্বপ্ন দেখি, কিন্তু ছোট অভ্যাস বদলাই না। নববর্ষ আমাদের বলে-স্বপ্নের পায়ে হাঁটার জুতো পরাও অভ্যাস দিয়েই। আজ একটু আগে ঘুম থেকে ওঠা, আজ একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করা, আজ একটু বেশি কৃতজ্ঞ হওয়া- এই ছোট ছোট পরিবর্তনই বছর শেষে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
নববর্ষে অঙ্গীকার মানে নিজের ভেতরের আলো জ্বালানো। হতাশার অন্ধকারে আশার প্রদীপ, ব্যর্থতার ধুলোয় অধ্যবসায়ের জল। আমরা শিখি-সব পাওয়া যায় না, কিন্তু চেষ্টা থামানো যায় না। ক্ষমা করা দুর্বলতা নয়, ধৈর্য পরাজয় নয়, সততা লোকসান নয়। এগুলোই দীর্ঘ পথের সম্বল।
নববর্ষে অঙ্গীকার মানে প্রার্থনার মতো নরম এক দৃঢ়তা। শব্দ কম, অর্থ গভীর। আজ আমি নিজেকে একটু ভালো মানুষ করার পথে এক পা বাড়ালাম- এইটুকুই যথেষ্ট শুরু। বছর জুড়ে পথ কাঁটায় ভরা থাকবে, তবু অঙ্গীকারের মানচিত্র হাতে থাকলে আমরা দিশা হারাবো না। নববর্ষ তাই নতুন কাগজ নয়; পুরোনো হৃদয়ে নতুন লেখা- যেখানে প্রতিটি দিন সাক্ষী দেবে আমাদের প্রতিশ্রুতির।
লেখক : সম্পাদক, প্রতিভা

