যৌবনের ইবাদত
শীতের অজু এবং গরমের রোজার শিক্ষা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:১৬
ইসলাম আমাদের জীবনের প্রতিটি সময়ে ইবাদতের গুরুত্ব শেখায়। বিশেষ করে যৌবনকাল- যেখানে উদ্যম, শক্তি ও মনোবল সর্বাধিক থাকে। এই সময়ের ইবাদত আমাদের আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে, ধৈর্য শেখায় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম। শীতের অজু এবং গরমের রোজা কেবল শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখে না, বরং মনকে শান্ত ও মনোযোগী রাখে, আত্মাকে পবিত্র করে এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।
শীতের অজু: আত্মিক ও শারীরিক পবিত্রতা
শীতকালে ঠাণ্ডা পানিতে অজু করা অনেকের জন্য কষ্টদায়ক মনে হতে পারে। অনেকেই মনে করেন যে ঠান্ডার কারণে অজু করা কঠিন, তাই তা এড়িয়ে চলা উচিত। তবে নবী করিম (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, অজু করা কেবল শরীরকে পরিষ্কার রাখে না, এটি পাপমুক্তির পথ এবং আত্মাকে শুদ্ধ রাখে।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, "অবশ্যই আল্লাহ পরিষ্কারকে ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারাহ ২২২) নবী করিম (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি প্রতিদিন অজু সম্পূর্ণভাবে করবে এবং দুই রাকাত নামাজ পড়বে, তার পূর্ববর্তী পাপগুলো ক্ষমা করা হবে।" (সহীহ আল-বুখারি: ১৯৩৪) শীতের অজু যৌবনের শক্তি এবং উদ্যমকে আল্লাহর পথে নিয়োজিত রাখে। এটি আত্মসংযম, সতর্কতা এবং নিয়মানুবর্তিতার শিক্ষা দেয়, যা যুবকের জীবনে নৈতিক চরিত্র গঠনে অপরিহার্য। শীতের দিনে ঠাণ্ডা পানির মধ্যে অজু করা শরীরের জন্যও উপকারী। এটি রক্ত সঞ্চালনকে সক্রিয় রাখে এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
গরমের রোজা: সংযম, ধৈর্য ও নৈতিক শিক্ষা
গরমকালে রোজা পালন শারীরিকভাবে কষ্টদায়ক মনে হতে পারে। দীর্ঘ সময় পানির অভাব, সূর্যের তাপ এবং অতিরিক্ত শ্রমের কারণে শরীর কদ্বান্ত হয়ে যায়। তবে রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণার নিয়ন্ত্রণ নয়, এটি আত্মসংযম, সংযমী চরিত্র এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। কোরআনে আল্লাহ বলেন: "হে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমী হতে পারো।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৩) রোজা মানে শুধু খাদ্য ও পানির বিরতি নয়। এটি মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ক্ষুধা ও বাসনা সংযমে রাখা এবং ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক পথ। যুবকরা যদি গরমের কষ্ট সত্ত্বেও রোজা পালন করেন, তাদের মানসিক দৃঢ়তা ও ধৈর্য বৃদ্ধি পায়।
নবী করিম (সা.) বলেছেন: শহীদদের মতোই রোজাদারের জন্য বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, এবং রোজা আমার জন্য; আমি এরই পুরষ্কার দেব।"(সহীহ মুসলিম ১১৫১) গরমের রোজা যুবককে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করে, উদ্যমী করে তোলে এবং দৈনন্দিন জীবনে সংযমী হওয়া শেখায়। এটি জীবনের বিভিন্ন চাপ ও সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি করে।
যৌবনের ইবাদতের বিশেষ করে যৌবন হলো শক্তি, উদ্যম এবং নৈতিক চরিত্রের বিকাশের সময়। নবী করিম (সা.) বলেছেন: যুবক বয়সে যারা সৎ পথে চলবে, তাদের কাজ আল্লাহর কাছে প্রিয়।" (সহিহ তিরমিজি: ৩০৮৮)
শীতের অজু এবং গরমের রোজা যৌবনের এই শক্তি আল্লাহর পথে নিয়োজিত করে। এটি কেবল শারীরিক অনুশীলন নয়, বরং আত্মিক ও নৈতিক দৃঢ়তা প্রদান করে। নিয়মিত ইবাদত যুবকের চরিত্র, ধৈর্য এবং আত্মসংযম বিকাশে সহায়তা করে।
শীতের অজু মনকে সতেজ রাখে, শরীরের রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে এবং নামাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করে। গরমের রোজা সংযম শেখায়, ধৈর্য বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ দেয়। যৌবনের সময় এই ইবাদত পালনে যুবক জীবনের পরবর্তী ধাপে নৈতিকভাবে শক্তিশালী ও আত্মিকভাবে উন্নত হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, শীতের অজু এবং গরমের রোজা কেবল ধর্মীয় অনুশীলন নয়, এটি আত্মিক ও নৈতিক শিক্ষারও মাধ্যম।
অজু আত্মিক পবিত্রতা ও পাপমুক্তির পথ। রোজা ধৈর্য, সংযম এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপায়। নতুন বছরে আল্লাহ আমাদের সবাইকে শীতের অজু ও গরমের রোজা যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন, আমিন।
লেখক : কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক প্রবন্ধকার, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

