মুসলিম সমাজে মৃত্যুর পর প্রিয়জনের কবর জিয়ারত করা একটি আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ আমল। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই ফুল দেন, পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন, ভাবেন। এতে মৃতের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশ্ন জাগে-কবরে ফুল নয়; বরং দোয়া দেওয়া কি অধিক অর্থবহ নয়?
ইসলাম মানুষের জীবনকে শুধু পার্থিব পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এনেছে। কবর হলো আখিরাতের প্রথম ধাপ। সেখানে মৃত ব্যক্তি তার আমল ছাড়া কিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে না। জীবিতদের পক্ষ থেকে যে জিনিসটি মৃতের উপকারে আসে, তা হলো দোয়া, সদকা ও নেক আমল। এই সত্যটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে কুরআন ও হাদিসের আলোকে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং আমাদের পূর্বে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে ক্ষমা করুন।’ [সুরা হাশর : ১০]
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী মৃত মুমিনদের জন্য দোয়া করা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ও পছন্দনীয় আমল। অন্যদিকে কবরের ওপর ফুল দেওয়ার বিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে কোনো নির্দেশনা নেই। এটি মূলত সংস্কৃতিগত একটি অভ্যাস, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
নবী মুহাম্মদ (সা.) কবর জিয়ারতকে শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা কবর জিয়ারত করো, কারণ তা তোমাদের আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’ এই জিয়ারতের মূল উদ্দেশ্য হলো-নিজের মৃত্যুর কথা ভাবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং মৃতের জন্য দোয়া করা। কোথাও তিনি কবর সাজানো বা ফুল দেওয়ার নির্দেশ দেননি।
কবরে ফুল দিলে সাময়িকভাবে তা সুন্দর দেখাতে পারে, কিন্তু মৃতের আত্মার কোনো উপকার হয় না। ফুল কিছু সময় পর শুকিয়ে যায়, পঁচে যায়। ঠিক যেমন দুনিয়ার সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু দোয়া এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায় এবং মৃতের কবরকে নুরে ভরে দিতে পারে।
হাদিসে এসেছে, মানুষের মৃত্যুর পর তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস চলমান থাকে। সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তানদের দোয়া। এখানে স্পষ্টভাবে দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
আজ আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, কবর জিয়ারতে গিয়ে ফুল দেওয়া হয়, কিন্তু দোয়ার দিকে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয় না। এটি এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। ভালোবাসা যদি সত্যিই প্রকাশ করতে চাই, তবে তা হওয়া উচিত আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়ার মাধ্যমে, ‘হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন, তার কবরকে প্রশস্ত করুন, তাকে জান্নাতের মেহমান বানান।’
কবরের পাশে ফুল নয়, দোয়া দিন। ফুল চোখে শান্তি দিলেও দোয়া আত্মাকে শান্তি দেয়। ফুল ক্ষণস্থায়ী, দোয়া চিরস্থায়ী সওয়াবের উৎস। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো সংস্কৃতির আবরণে নয়; বরং ইসলামের আলোকে মৃতদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করা। দোয়াই হোক আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা, প্রকৃত ভালোবাসা ও প্রকৃত উপহার।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া গাজীপুর

