ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু রাত আছে, যেগুলো কেবল সময়ের হিসাব নয়। আকিদা, বিশ্বাস ও আত্মিক জাগরণের মাইলফলক। মেরাজের রাত তেমনই এক অলৌকিক অধ্যায়। এই রাতে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, হজরত মুহাম্মদ সা., দুনিয়ার সীমা অতিক্রম করে আসমানসমূহ পেরিয়ে আরশের নিকটবর্তী হন। তাই তিনি হয়ে ওঠেন আরশের মেহমান।
মক্কার জীবনের সেই সময়টা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। প্রিয় স্ত্রী খাদিজা রা. ও চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালে নবীজির হৃদয় ভারাক্রান্ত। তায়েফে দাওয়াত দিতে গিয়ে পেয়েছেন নির্যাতন ও অবহেলা। মানবিক সহায়তার সব দরজা যেন বন্ধ। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাকে সম্মান ও সান্ত¡নার অনন্য উপহার দেন মেরাজের সফর।
রাতের শুরুতে নবীজিকে নেওয়া হয় পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায়। এটি ছিল ইসরা-এক রাতের মধ্যেই দূরত্ব অতিক্রমের অলৌকিক ভ্রমণ। এখানে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের ইমামতি করেন। এই ইমামত যেন ঘোষণা করল-সব নবুওয়াতের উত্তরাধিকার আজ তাঁর হাতেই ন্যস্ত।
এরপর শুরু হয় ঊর্ধ্বগমন-আসমানসমূহের দিকে যাত্রা। সঙ্গী ছিলেন ফেরেশতাদের নেতা হজরত জিবরাইল আ.। প্রথম আসমানে আদম আ., দ্বিতীয় আসমানে ঈসা আ. ও ইয়াহইয়া আ., তৃতীয় আসমানে ইউসুফ আ.-এভাবে একে একে নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। প্রতিটি সাক্ষাৎ ছিল সম্মান, স্বীকৃতি ও ভালোবাসার বার্তা।
সপ্তম আসমানে পৌঁছে নবীজি দেখলেন সিদরাতুল মুনতাহা সৃষ্টির শেষ সীমা। এখানেই জিবরাইল আ. থেমে গেলেন। তিনি বললেন, ‘এখান থেকে এক কদম এগোলে আমি ভস্ম হয়ে যাব।’ কিন্তু প্রিয় নবীর জন্য পথ তখনও খোলা। তিনি একাই অগ্রসর হলেন, যেখানে কোনো মানুষ বা ফেরেশতা আগে পৌঁছায়নি।
সিদরাতুল মুনতাহার পাশে নবীজি দেখলেন বায়তুল মামুর। যেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা তাওয়াফ করে, আর তারা আর কখনো সেখানে ফিরে আসে না। এই দৃশ্য নবীজির হৃদয়ে আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতা ও শৃঙ্খলার গভীর উপলব্ধি জাগিয়ে তোলে।
এরপর সেই মহামুহূর্ত নবীজি পৌঁছালেন আরশের সান্নিধ্যে। কীভাবে, কোন রূপে; তা মানুষের ভাষায় ধরা যায় না। কুরআন বলেছে, ‘চোখ বিভ্রান্ত হয়নি, সীমা অতিক্রমও করেনি।’ এখানে নবীজি সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের সৌভাগ্য লাভ করেন। এ এক সম্মান, যা অন্য কোনো সৃষ্টির ভাগ্যে জোটেনি। তাই তিনি সত্যিই আরশের মেহমান।
এই সাক্ষাতের উপহার ছিল উম্মতের জন্য অনন্য নেয়ামত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলো। শুরুতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নির্ধারিত হলেও উম্মতের কষ্টের কথা ভেবে তা কমিয়ে পাঁচে নামিয়ে আনা হয়-কিন্তু সওয়াব রইল পঞ্চাশের সমান। নামাজ হয়ে উঠল মুমিনের মেরাজ। যে ইবাদতের মাধ্যমে প্রতিদিন বান্দা তার রবের সান্নিধ্যে পৌঁছে।
মেরাজ শুধু অলৌকিক সফরের গল্প নয়; এটি ঈমানের পরীক্ষা। যারা বস্তুবাদী যুক্তিতে সব মাপতে চেয়েছে, তারা একে অস্বীকার করেছে। আর যারা আল্লাহর কুদরতে বিশ্বাস রেখেছে, তাদের ঈমান আরও দৃঢ় হয়েছে। হজরত আবু বকর রা. এক বাক্যে বলেছিলেন, ‘তিনি যদি বলে থাকেন, তবে তা অবশ্যই সত্য।’ এই বিশ্বাসই সিদ্দিকিয়াতের মানদণ্ড।
এই রাত আমাদের শেখায়- কষ্টের পরই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ আসে। যখন দুনিয়া সংকুচিত হয়ে যায়, তখন আসমানের দরজা খুলে যায়। মেরাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে একা ছেড়ে দেন না; বরং উপযুক্ত সময়ে সম্মানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন।
আরশের মেহমানের এই ঘটনা আজও মুসলমানদের হৃদয়ে আলো জ্বালায়। নামাজের প্রতি টানে, আখিরাতের পথে দৃঢ় করে, আর দুনিয়ার দুঃখে আশার প্রদীপ জ্বেলে দেয়। মেরাজ প্রমাণ করে- মানুষ মাটি থেকে উঠে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছাতে পারে, যদি সে বিশ্বাস, আনুগত্য ও ভালোবাসার পথে অটল থাকে।
আজও যখন কোনো মুমিন গভীর রাতে সিজদায় মাথা রাখে, তখন সে অজান্তেই আরশের মেহমানের সেই স্মৃতির পথে হাঁটে। নামাজের প্রতিটি তাকবির, রুকু ও সিজদা যেন মেরাজেরই ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। দুনিয়ার কোলাহল পেরিয়ে হৃদয়ের আসমানে উঠে সে খুঁজে নেয় রবের সান্নিধ্য। এই পথ দেখিয়েছেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক, হজরত মুহাম্মদ সা.। যিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, আসমানে ওঠার সিঁড়ি কোনো কল্পনা নয়; তা হলো আনুগত্য, নামাজ ও তাকওয়া।
মেরাজের শিক্ষা তাই কেবল ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিদিনের জীবনে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার আহ্বান। দুঃখ, ব্যথা ও একাকিত্বে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে তাকানোর অনুপ্রেরণা। কারণ যিনি এক রাতে তাঁর প্রিয় বান্দাকে আরশের নৈকট্যে পৌঁছে দিতে পারেন, তিনি প্রতিটি বিশ্বাসী হৃদয়ের আর্তিও শুনতে সক্ষম।
আরশের মেহমানের স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষ যতই দুর্বল হোক, বিশ্বাসে দৃঢ় হলে সে উচ্চতার শিখরে পৌঁছাতে পারে। এই বিশ্বাসই আমাদের চলার শক্তি, এই আশাই আমাদের আলো। মেরাজ তাই শুধু অতীতের এক অলৌকিক রাত নয়; এটি বর্তমানের পথনির্দেশ আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রæতি-আল্লাহর নৈকট্য লাভের অমলিন আহ্বান।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া গাজীপুর, ঢাকা

