ইন্টারনেট ও ভিপিএন ব্যবহারে শরিয়াহ বিধান
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:১২
বর্তমান যুগে ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, গবেষণা, যোগাযোগ- প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইন্টারনেটের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই উপকারী মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে শরঈ প্রশ্নও কম নয়। বিশেষ করে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা, অন্যকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেওয়া, ওয়াই-ফাই হ্যাক করা কিংবা ঠচঘ ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে নানা বিভ্রান্তি দেখা যায়। এই প্রবন্ধে এসব বিষয়কে শরীয়তের আলোকে তুলে ধরা হলো।
ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসার বিধান
শরীয়তের দৃষ্টিতে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা করা মূলত জায়েজ। কারণ ইন্টারনেট কেবল খারাপ কাজে ব্যবহৃত হয় না; বরং এর মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষা, বৈধ ব্যবসা, দাওয়াহ, যোগাযোগ ও মানবকল্যাণমূলক বহু কাজ সম্পন্ন হয়। ফলে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করে যে অর্থ উপার্জন করা হয়, তা সেবার বিনিময়ে প্রাপ্ত পারিশ্রমিক, যা গ্রহণ করা বৈধ। যদি কেউ সেই সংযোগ ব্যবহার করে গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে তার গুনাহের দায় তার নিজের ওপরই বর্তাবে। সংযোগদাতা এ ক্ষেত্রে দায়ী হবে না। (ফাতাওয়া শামি, গণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৬৩) অন্যের ওয়াই-ফাই হ্যাক করে চালানোর বিধান
আজকাল অনেকেই পাশের বাসার বা পরিচিত কারো ওয়াই-ফাই হ্যাক করে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি স্পষ্টভাবে হারাম। কারণ এতে অন্যের সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়, তার ইন্টারনেটের গতি কমে যায় এবং সাধারণত সে এতে সন্তুষ্ট থাকে না। ইসলামে কারো মালিকানাধীন কোনো বস্তু তার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বৈধ নয়। (আল-মাজাল্লাহ-১/২৩০)
নিজের ইন্টারনেট অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়া
কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজের ইন্টারনেট প্রতিবেশী বা অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেন এবং তারা সেই ইন্টারনেট দিয়ে কোনো ভুল বা গুনাহের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে, তাহলে সাধারণ অবস্থায় এর গুনাহ সংযোগদাতার ওপর বর্তায় না। কারণ এখানে গুনাহটি সংঘটিত হচ্ছে ব্যবহারকারীর স্বাধীন ও ইচ্ছাকৃত কর্মের মাধ্যমে। তবে যদি কারো ব্যাপারে প্রবল ধারণা থাকে যে সে ইন্টারনেটকে নিশ্চিতভাবে হারাম কাজে ব্যবহার করবে, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। এমন ক্ষেত্রে সংযোগ না দেওয়াই উত্তম, যাতে কোনো পর্যায়ে গুনাহের সহযোগী হওয়া না লাগে। (ফতোয়া দারুল উলুম দেওবন্দ: ফতোয়া নম্বর: ১৪৫৮৭৯)
VPN ব্যবহার করার বিধান
VPN (Virtual Private Network) এমন একটি প্রযুক্তি, যা ব্যবহারকারীর আসল আইপি অ্যাড্রেস গোপন রাখে এবং ইন্টারনেট সংযোগকে সুরক্ষিত করে। এর মাধ্যমে অনেক সময় ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যায়। এই প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়; বরং এর ব্যবহার নির্ভর করে উদ্দেশ্যের ওপর। VPN-এর বৈধ ও অবৈধ ব্যবহার: ব্যক্তিগত তথ্য হ্যাকারদের হাত থেকে সুরক্ষা, বৈধ ব্যবসা ও ব্যাংকিং লেনদেনে নিরাপত্তা, কিংবা অযৌক্তিকভাবে ব্লক করা ইসলামি ও শিক্ষামূলক ওয়েবসাইটে প্রবেশ, এসব ক্ষেত্রে VPN ব্যবহার করা শরীয়তসম্মত। তবে, রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কর্তৃপক্ষ যদি VPN ব্যবহারের জন্য নিবন্ধন বা অনুমতি বাধ্যতামূলক করে, তাহলে তা মানা জরুরি; অন্যথায় আইন অমান্যের গুনাহ হবে। অন্যদিকে, VPN ব্যবহার করে যদি কোন গুনাহের কাজ করে, কিংব্য প্রতারণা ও অবৈধ কাজ গোপন করা হয়, তাহলে এসব ক্ষেত্রে VPN ব্যবহার করা হারাম। (ফাতাওয়া শামি, ৩/১৪)
ধীরগতির ইন্টারনেটের জন্য VPN ব্যবহার করার বিধান
যদি কেউ কেবল ইন্টারনেটের গতি বা সংযোগের মান উন্নত করার জন্য VPN ব্যবহার করে এবং এতে কোনো অবৈধ বা অনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকে, পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইন ও কোম্পানির নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হয়, তাহলে এমন ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। ভিপিএন ব্যবহার করে সীমিত ইন্টারনেট প্যাকেজ আনলিমিটেড করার হুকুম: বর্তমান সময়ে এমন কিছু ভিপিএন (VPN) অ্যাপ দেখা যাচ্ছে, যার মাধ্যমে মোবাইল অপারেটর কর্তৃক নির্ধারিত সীমিত ইন্টারনেট প্যাকেজকে কার্যত আনলিমিটেড করে ব্যবহার করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি অ্যাপের জন্য বরাদ্দকৃত মাসিক প্যাকেজ সক্রিয় করে, এরপর একটি ভিপিএন অ্যাপ ব্যবহার করে শুধু উক্ত পেকেজ নয়; বরং ইউটিউব, গুগল, ফেসবুকসহ সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। উক্ত পদ্ধতিতে সাধারণত একটি সীমিত ইন্টারনেট প্যাকেজের মূল্য পরিশোধ করা হয়; কিন্তু ভিপিএনের মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে অতিরিক্ত ও পূর্ণ ইন্টারনেট সুবিধা গ্রহণ করা হয়।
উপরোক্ত বিষয়টির বিধান হলো, যদি কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ ইন্টারনেট প্যাকেজের মূল্য পরিশোধ করে, অথচ ভিপিএন ব্যবহার করে সেই সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তাহলে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে ধোঁকাবাজি এবং অন্যায়ভাবে অধিক সুবিধা গ্রহণ হিসেবে গণ্য হবে। আর ইসলামে কোনো চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে নিজের অধিকার বহির্ভূত সুবিধা গ্রহণ করা সম্পূর্ণভাবে নাজায়েজ। যেহেতু মোবাইল কোম্পানি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সেবাই প্রদানের অনুমতি দেয়, সেহেতু সেই সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার করা বৈধ নয়। অতএব, সীমিত ইন্টারনেট প্যাকেজকে ভিপিএনের মাধ্যমে আনলিমিটেড করে ব্যবহার করা শরয়ি দৃষ্টিতে নাজায়েজ। এ ধরনের পদ্ধতি থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। (আল-আশবাহ-১/২১২) সফটওয়্যার ব্যবহার ও ভিডিও এডিটিংয়ের শরয়ী নীতিমালা
ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির এই যুগে সফটওয়্যার ব্যবহার এবং ভিডিও এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি হলো-যদি কোনো সফটওয়্যার সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী কোম্পানি বা স্বতাধিকারীর পক্ষ থেকে সর্বসাধারণের জন্য বিনামূল্যে (Free) উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিধিনিষেধ বা শর্তারোপ না করা হয়, তবে সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে তা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বৈধ বা জায়েজ। তবে যদি কোনো সফটওয়্যার কোম্পানি তার কপিরাইট বা মালিকানাস্বত্ব সংরক্ষিত রাখে এবং বিনা অনুমতিতে সেটির অনুলিপি (Copy) তৈরি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হয়, তাহলে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে সেই সফটওয়্যারের অননুমোদিত কপি তৈরি করা বা তা বাজারে বিক্রি করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
ভিডিও এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়
ইসলামি বিধান অনুযায়ী- কোনো প্রাণীর (মানুষ বা অন্য কোনো জীব) ছবি সংবলিত ভিডিও তৈরি করা কিংবা এ জাতীয় ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ করা জায়েজ নয়। তবে যদি ভিডিওটি কোনো নিষ্প্রাণ বা জড় বস্তু (যেমন: প্রকৃতি, আসবাবপত্র, ঘরবাড়ি ইত্যাদি) কেন্দ্রিক হয় এবং তাতে গান-বাজনা কিংবা অন্য কোনো শরয়ী গর্হিত বিষয় না থাকে, তাহলে উক্ত ভিডিও এডিটিং করার সুযোগ রয়েছে।
মুদাররিস : জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা

