পোশাক কেবল দেহ আচ্ছাদনের অনুষঙ্গ নয়, এটি একটি জাতির বিশ্বাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পরিচয়ের নীরব ভাষ্য। মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে বোরকা ঠিক তেমনই সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এটি একদিকে ধর্মীয় নির্দেশনা অনুসরণ করার বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে হাজার বছরের ইসলামি সভ্যতা ও শালীনতার ধারাবাহিক উত্তরাধিকার।
আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যখন বোরকাকে কখনো ‘পশ্চাৎপদতা’, কখনো ‘নারী স্বাধীনতার অন্তরায়’, আবার কখনো অসৎ নারীদের পোশাক হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন ইতিহাস, ধর্ম ও বাস্তবতার আলোকে বোরকার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।
বোরকা একটি নীতিগত কাঠামো
ইসলামে পর্দার মূল দর্শন এসেছে কোরআন ও সুন্নাহ থেকে। আল্লাহ তাআলা সুরা নুরের ৩১ নম্বর আয়াতে মুমিন নারীদের শালীনতা রক্ষা, দৃষ্টি সংযত করা এবং সৌন্দর্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘(হে নবী! মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে তা ব্যতীত নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন নিজেদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
এমনিভাবে সুরা আহজাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে নবীজি (সা.)-এর স্ত্রীগণ ও মুমিন নারীদের জিলবাব পরিধানের নির্দেশ রয়েছে, যাতে তারা পরিচিত হয় এবং উত্ত্যক্ত না হয়। ইরশাদ হয়েছে, "হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, তোমার কন্যাদেরকে আর মু’মিনদের নারীদেরকে বলে দাও- তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয় (যখন তারা বাড়ীর বাইরে যায়), এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে এবং তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
সুতরাং বোরকা একটি নীতিগত কাঠামো, যার উদ্দেশ্য নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান রক্ষা করা। যুগে যুগে অঞ্চলভেদে এর রূপ ভিন্ন হয়েছে, কিন্তু মূল দর্শন অপরিবর্তিত থেকেছে।
পর্দা না করলে হাদিসে কঠোর ধমকি রয়েছে রাসুল (সা:) বলেন, “দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামের অধিবাসী যাদেরকে আমি দেখিনি। তারা ভবিষ্যতে আসবে। প্রথম শ্রেণী হবে একদল অত্যাচারী, যাদের সঙ্গে থাকবে গরুর লেজের মত চাবুক যার দ্বারা তারা লোকদেরকে প্রহার করবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী হল সে নারীর দল, যারা কাপড় পরিধান করবে কিন্তু তবুও তারা উলঙ্গ অবস্থায় থাকবে, নিজেরা অন্যদের প্রতি আকৃষ্ট এবং অন্যদেরকেও তাদের প্রতি আকৃষ্ট করবে, যাদের মস্তক (খোঁপা বাধার কারণে) উটের হেলে যাওয়া কুঁজের মত হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তার গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ বহু দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।” (মুসলিমঃ ২১২৮)
মুসলিম সভ্যতায় বোরকা
ইসলামি সভ্যতার উত্থানলগ্ন থেকেই মুসলিম নারীরা শালীন পোশাককে নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নববি ও সাহাবি যুগ বটেই, আব্বাসীয়, উমাইয়া শাসনামল, উসমানীয় কিংবা মোগল আমলেও মুসলিম নারীদের পোশাক ছিল মর্যাদাসম্পন্ন ও পর্দাশীল।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ইতিহাসের বহু জ্ঞানী, কবি, ব্যবসায়ী ও সমাজসংস্কারক নারী ছিলেন বোরকা বা পর্দার আড়ালেই সক্রিয়। তাঁরা শিক্ষা দিয়েছেন, ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, এমনকি হাদিসও বর্ণনা করেছেন। যা প্রমাণ করে বোরকা কখনোই নারীকে গৃহবন্দি করেনি, বরং শালীনতার সীমারেখা রক্ষা করেই সমাজে সক্রিয় থাকার সুযোগ দিয়েছে।
বোরকা অনন্য মর্যাদার প্রতীক
আধুনিক পাশ্চাত্য আলোচনায় বোরকাকে প্রায়ই নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া দমনমূলক ও নিষ্পেষণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশ্বের অসংখ্য মুসলিম নারী স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে ও আত্মপরিচয়ের গর্ববোধ থেকেই বোরকা পরিধান করেন।
একজন নারীর শরীরকে পণ্যে পরিণত করার যে সংস্কৃতি, বোরকা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নারীকে পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান ও অনন্য মর্যাদায় সমাসীন করে। যেখানে বিজ্ঞাপন, মিডিয়া ও ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি নারীর সৌন্দর্যকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করেছে, সেখানে বোরকা নারীর ব্যক্তিত্বকে দেহের গড়ন ছাড়িয়ে চরিত্র, মেধা ও আত্মমর্যাদায় উন্নীত করে।
ইউরোপের কিছু দেশে বোরকা নিষিদ্ধকরণ আইন মুসলিম নারীদের পরিচয় সংকটকে আরও গভীর করেছে। এসব নিষেধাজ্ঞা মূলত নিরাপত্তা বা নারী অধিকারের যুক্তিতে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে তা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বোরকা পরা নারীকে মুক্ত করার নামে তার পোশাকের ওপর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ আসলে আরেক ধরণের দমন। প্রকৃত নারীমুক্তি তখনই সম্ভব, যখন নারী স্বাধীনভাবে তার ধর্মীয় পোশাক পরে নিজের শালীনতা প্রকাশ ও ইজ্জত-সম্মানের হেফাজত করতে পারবে।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

