Logo

ইসলাম

ইসলামি শরিয়তে হাদিসের গুরুত্ব-তাৎপর্য

Icon

সুলতান মাহমুদ সরকার

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৪

ইসলামি শরিয়তে হাদিসের গুরুত্ব-তাৎপর্য

ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম; যা মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব স্তরের জন্য দিকনির্দেশনা দেয়। এই দিকনির্দেশনার মূল আলো আসে আল্লাহর কিতাব আল কোরআন থেকে। কিন্তু কোরআনের সেই আলোকে বাস্তব জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি প্রশ্নে ও প্রতিটি সংকটে কার্যকর ও বোধগম্য করে তুলেছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর কথা, কাজ, নীরব সম্মতি ও চরিত্রের যে সংরক্ষিত ভাণ্ডার, সেটিই হাদিস। তাই ইসলামি শরীয়তের আলোচনা কোরআন দিয়ে শুরু হলেও হাদিস ছাড়া তা কখনো পূর্ণতা পায় না। কোরআন ও হাদিস-এই দুই উৎসের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে ইসলামি আইন, নৈতিকতা ও সভ্যতার ভিত্তি।

হাদিস মানেই সাধারণ বর্ণনা নয়, বরং এটি নবুয়তের জীবন্ত দলিল। হাদিস হলো সেই আয়না, যেখানে কোরআনের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ হয়ে উঠেছে মানবীয় রূপে। বিশ্বনবী (সা.) কোরআনের প্রথম ব্যাখ্যাকার, প্রথম অনুসারী এবং সর্বোত্তম বাস্তবায়নকারী। আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু সেই নির্দেশ কিভাবে পালন করতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে তা প্রয়োগ হবে সবকিছুই হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। ফলে হাদিসকে বাদ দিয়ে কোরআন বোঝা মানে মূল পাঠকে তার বাস্তব প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

হাদিসের পরিচিতি দিতে গিয়ে বলতে হয়, এটি মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)- এর বাণী, কর্ম ও সমর্থনের সংকলন। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজ গভীর মনোযোগে সংরক্ষণ করেছেন, কারণ তাঁরা জানতেন- নবীর প্রতিটি আচরণই উম্মতের জন্য পথনির্দেশ। পরবর্তীকালে তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনগণ সেই হাদিস সংরক্ষণে যে সতর্কতা, গবেষণা ও আত্মত্যাগ দেখিয়েছেন, তা মানব ইতিহাসে বিরল। সনদ যাচাই, বর্ণনাকারীর চরিত্র বিশ্লেষণ, বর্ণনার সামঞ্জস্য পরীক্ষা, এই কঠোর পদ্ধতির মাধ্যমে হাদিস শাস্ত্র গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞানব্যবস্থা হিসেবে।

ইসলামি শরীয়তের উৎস হিসেবে হাদিসের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। কোরআনের পরে শরীয়তের দ্বিতীয় প্রধান উৎস হলো হাদিস, এই বিষয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে। নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ- ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোর অধিকাংশ বিস্তারিত বিধান কোরআনে সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে, কিন্তু তার পূর্ণাঙ্গ রূপ হাদিসের মাধ্যমেই জানা যায়। নামাজ কায়েমের নির্দেশ কোরআনে আছে, কিন্তু নামাজের রাকাআত, পদ্ধতি, সময় ও শর্ত- সবই এসেছে হাদিস থেকে। রোজার নিয়ত, যাকাতের নিসাব, হজের আনুষ্ঠানিকতা- সব ক্ষেত্রেই হাদিস কোরআনের ব্যাখ্যা ও বাস্তব রূপরেখা প্রদান করেছে।

বিশ্বনবী (সা.)- এর আদর্শ অনুসরণের প্রশ্নে হাদিসের ভূমিকা আরও গভীর। আল্লাহ তা’য়ালা কোরআনে স্পষ্টভাবে বলেছেন, রাসুল (সা.)-এর অনুসরণই আল্লাহর অনুসরণ। কিন্তু সেই অনুসরণ কিভাবে হবে? কোন আচরণে, কোন নীতিতে, কোন মনোভাব নিয়ে? এর উত্তর রয়েছে হাদিসে। নবীর ধৈর্য, ইনসাফ, দয়া, সাহস, ক্ষমাশীলতা, নেতৃত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব- সবকিছু হাদিসের মাধ্যমে আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। হাদিস আমাদের শেখায় কীভাবে শত্রুর সাথেও ন্যায়বিচার করতে হয়, কীভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হয়, কীভাবে ক্ষমতার আসনে থেকেও বিনয়ী থাকা যায়।

হাদিস কেবল ইবাদতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জ্ঞান, বিজ্ঞান ও মানবমুক্তির পথেও আলোকবর্তিকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) জ্ঞান অর্জনকে ফরজ ঘোষণা করেছেন, চিন্তা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করেছেন, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। হাদিসে পাওয়া যায় স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক ভারসাম্যের শিক্ষা। আধুনিক বিজ্ঞান আজ যেসব বিষয়ে কথা বলছে- পরিমিত জীবন, মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক সহমর্মিতা- হাদিস সেই মূল্যবোধ বহু আগেই মানবজাতিকে উপহার দিয়েছে।

মানুষের ব্যক্তি গঠনে হাদিসের প্রভাব অপরিসীম। একজন মানুষ কেমন চরিত্রের হবে, কীভাবে সে নিজেকে সংযত রাখবে, কীভাবে সে লোভ, হিংসা ও অহঙ্কার থেকে মুক্ত থাকবে এই নৈতিক প্রশিক্ষণ হাদিসের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। নবী (সা.) বলেছেন, তিনি প্রেরিত হয়েছেন উত্তম চরিত্র পূর্ণতা দান করার জন্য। এই একটি বাণীই হাদিসের নৈতিক দর্শনকে সংক্ষেপে তুলে ধরে। হাদিস মানুষকে দায়িত্বশীল, সৎ ও আত্মসংযমী করে তোলে।

সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও হাদিস একটি শক্ত ভিত্তি। পারিবারিক সম্পর্ক, প্রতিবেশীর অধিকার, ব্যবসায়িক সততা, শ্রমিকের মর্যাদা, নারীর সম্মান, শিশুর অধিকার- সব বিষয়ে হাদিস সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। একটি সমাজ তখনই সুস্থ হয়, যখন সেখানে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত থাকে। হাদিস সেই ন্যায়বিচারের ভাষা শেখায়, সেই নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে।

রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নেও হাদিস উপেক্ষণীয় নয়। নেতৃত্বের যোগ্যতা, শাসকের জবাবদিহি, ক্ষমতার অপব্যবহার নিষেধ, জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার- এইসব রাষ্ট্রীয় নীতির মূলেও রয়েছে হাদিসের শিক্ষা। নবী (সা.) নিজে ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক ও সেনাপতি এবং তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত আজও ন্যায়ভিত্তিক শাসনের মডেল হিসেবে বিবেচিত।

কোরআনের ব্যাখ্যা ও অনুসরণের ক্ষেত্রে হাদিসের ভূমিকা সবচেয়ে মৌলিক। কোরআন একটি চিরন্তন গ্রন্থ, কিন্তু তার আয়াতসমূহ অনেক সময় সংক্ষিপ্ত ও সার্বজনীন ভাষায় এসেছে। সেই ভাষার ব্যাখ্যা, প্রেক্ষাপট ও প্রয়োগ বুঝতে হাদিস অপরিহার্য। হাদিস ছাড়া কোরআনের অনেক আয়াতের সঠিক অর্থ অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাই যারা হাদিস অস্বীকার করে কেবল কোরআনের কথা বলে, তারা আসলে কোরআনকেই অসম্পূর্ণভাবে বোঝে।

আজকের বিশ্বে যখন বিভ্রান্তি, চরমপন্থা ও মূল্যবোধের সংকট দেখা দিচ্ছে, তখন হাদিসের সঠিক ও সুস্থ চর্চা আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে। বিকৃত ব্যাখ্যা নয়, বরং প্রামাণ্য ও সহিহ হাদিসের আলোকে জীবন পরিচালনাই পারে মানবতাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে। হাদিস অতীতের কোনো সাধারণ ইতিহাস নয়; এটি মানবতার এক প্রামাণ্য দলিল যা বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও পাথেয়।

সুতরাং ইসলামি শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে হাদিস কেবল একটি জ্ঞানভাণ্ডার নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত পথনির্দেশ। কোরআনের আলোকে নবীর জীবনে যে বাস্তব রূপ পেয়েছে, হাদিস সেই রূপকে যুগে যুগে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, ইবাদত থেকে সভ্যতা- সবকিছুতেই হাদিসের ছাপ সুস্পষ্ট। তাই হাদিসকে ধারণ করা মানে ইসলামের পূর্ণতা গ্রহণ করা। ইসলামি জীবনব্যবস্থার সত্যিকার সৌন্দর্য ও ভারসাম্য উপলব্ধি করতে হলে কোরআনের সাথে সাথে হাদিসের এই গভীর তাৎপর্য অনুধাবন ও সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : কলামিস্ট, এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ


প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর