মানুষ সামাজিক জীব। পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে মানুষের সঙ্গী বা বন্ধুর প্রয়োজন হয়। জীবন চক্রে মানুষের বন্ধু ও শত্রæ তৈরি হয়। বন্ধু ও বন্ধুত্ব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বন্ধু নির্বাচনে চাই সতর্কতা। সাধারণত মানুষ জীবনের নানা ক্ষেত্রে বন্ধুদের অনুসরণ করে। ভালো বন্ধুর সাহচর্য পেয়ে মানুষ যেভাবে পৃথিবী বদলে দিতে পারে, তেমনি অসৎ বন্ধুর খপ্পরে পড়ে মানুষ তার পুঁজি খুইয়ে নিঃস্ব হতে পারে। বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারলে, উপযুক্ত বন্ধু খুঁজে বের করতে পারলে সেই বন্ধু আমাদের দুনিয়া আখেরাতের সফলতার কারণ হয়। এর বিপরীতে বন্ধু নির্বাচনে ভুল করলে দুনিয়া আখেরাতের সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
এক বন্ধুর উপর অন্য বন্ধুদের প্রভাব কতটা, সে ব্যাপারে হাদিসে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। কারো ভালো ও মন্দ সম্পর্কে জানতে চাইলে তার বন্ধু-বান্ধবের খোঁজখবর নিতে হাদিসে বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ বন্ধু-বান্ধবের রীতিনীতি অনুসরণ করে। অতএব তোমরা ভালো করে দেখো কে কার সঙ্গে মিশছে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৮)
বন্ধুদের জীবনযাপন ও চিন্তা-ভাবনা বন্ধুর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে। তা যেমন কল্যাণকর হতে পারে, তেমনি অকল্যাণও বয়ে আনতে পারে। হাদিসে ভালো বন্ধুকে সুগন্ধি বিক্রেতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
কারণ সুপরামর্শ গ্রহণ না করলেও ভালো বন্ধুর মাধ্যমে তা জানার সুযোগ হয়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো মেশক বিক্রেতা ও কর্মকারের হাঁপরের মতো।
আতর বিক্রেতা থেকে তুমি শুন্য হাতে ফিরবে না। হয়তো তুমি আতর কিনবে, নয়তো তার সুবাস পাবে। আর কর্মকারের হাঁপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, নয়তো তুমি এর দুর্গন্ধ পাবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২১০১)
কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ক্ষেত্রে আমাদের সামনে থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টি। কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কেউ কাউকে ভালোবাসলে, বন্ধুত্ব করলে বা একসঙ্গে কিছু সময় কাটালে তাদের জন্য বিশেষ মর্যাদা। হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার ভালোবাসা ওই সব ব্যক্তির জন্য অবধারিত, যারা আমার জন্য পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসে। যারা আমার জন্য একত্র হয়। যারা আমার জন্য একে অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। যারা আমার জন্য পরস্পর খরচ করে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২২০৩০)
সামাজিক জীবনে ভালো বন্ধুর পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বরং অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুদের সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে চলাই অসম্ভব। তাই খাঁটি বন্ধু মানুষকে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচতে এবং ভুল-ভ্রান্তি দূর করতে সাহায্য করে। হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘একজন মুমিন অন্য মুমিনের আয়নার মতো। মুমিন মুমিনের ভাই। একজন অন্যজনের সহায়-সম্পদ সংরক্ষণ করে এবং তার অনুপস্থিতিতে সে তার পক্ষ থেকে সব দায়িত্ব পালন করে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৮)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘একজন মুমিন অন্য মুমিনের আয়নার মতো। একজন অন্যের মধ্যে কোনো ত্রæটি দেখলে তা ঠিক করে দেয়।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১৭৭)
অপরদিকে খারাপ বন্ধু তার একজন ভালো চরিত্রের বন্ধুকেও ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। আমরা দেখি, যারা আজ মদ-গাঁজা, আফিম-ভাং, বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি নেশাজাত বস্তুর প্রতি চরম আসক্ত, এক সময় তাদের এসবের প্রতি কোনো টান ছিল না, বরং উল্টো কারো কারো এসবের প্রতি এক ধরনের ভয় কাজ করত। কিন্তু কীভাবে এসবের মধ্যে জড়িয়ে গেল? জিজ্ঞেস করলে তারা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, কোনো অসৎ বন্ধুর প্ররোচনায় সে এসব আত্মবিধ্বংসী কাজে জড়িয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে নেশা গ্রহণের অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন কারাগারে বন্দি দুর্র্ধষ সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের ব্যাপারে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তাদের বেশিরভাগেরই ভ্রষ্টতা ও অন্ধকার পরিণতির নেপথ্যে কোনো না কোনো বন্ধুর হাত রয়েছে।
যে ছেলেরা বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখে বা যারা জীবনে অনেক মেয়ের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে, তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তারাও বলবে, কোনো না কোনো বন্ধুর প্ররোচনায় এসব অপকর্মে ফেসে গেছে। এমন লোক হয়তো পাওয়া যাবে না, যাদের জীবনে কোনো বন্ধু তাদেরকে এসব কাজে প্রথম উসকানি দেয়নি। অনেকেই আছে, যারা জীবনকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু বন্ধু ও সঙ্গীদের অনিষ্টের কারণে একসময় তারা তাদের চিন্তা ও কর্ম থেকে পিছিয়ে পড়েছে।
তাই আমাদের উচিত দীর্ঘ জীবন যাত্রার শুরুতেই একজন যোগ্য বন্ধুকে জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া। যে নিজে উদ্যোগী ও উদ্যমী, হিতাকাক্সক্ষী ও কল্যাণকামী। যে আমাকে সৎকাজে অনুপ্রেরণা যোগাবে, প্রয়োজনে সহযোগিতা করবে। আমি পথ ভুলে গেলেও পরম মমতায় টেনে আনবে সঠিক পথে।
লেখক : মুফতি ও মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদ্রাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা

