ফেসবুক ইউটিউবে ভুয়া তথ্যের ঢেউ, কোন পথে চলছে ডিজিটাল সমাজ?
আইন ও আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:১৩
ডিজিটাল যুগে তথ্য যেমন ক্ষমতা, তেমনি ভুল তথ্য সামাজিক অস্থিরতা, বিভ্রান্তি এবং কখনো-কখনো প্রাণহানির কারণও হতে পারে।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- বিশেষ করে ফেসবুকে এ মুহূর্তে ভুয়া সংবাদ, বিকৃত অডিও-ভিডিও এবং গুজব ছড়িয়ে পড়া একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি যেমন আমাদের যোগাযোগকে সহজ করেছে, তেমনি অপব্যবহারও বেড়েছে। প্রশ্ন হলো- এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের করণীয় কী? আর আইনি কাঠামো- কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে?
ভুয়া তথ্যের ঢেউ : ফেসবুকে ভুয়া পোস্ট, মনগড়া সংবাদ, কৃত্রিমভাবে তৈরি অডিও-ভিডিও (ডিপফেক) এখন আর বিরল কিছু নয়। রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে কেউ কারো ছবি ব্যবহার করে অবমাননাকর ভিডিও বানাচ্ছে, আবার কেউ মিথ্যা সংবাদ দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো জনমনে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা বাড়ানো। একেকটি বিকৃত অডিও-ভিডিও কয়েক মিনিটেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অথচ অধিকাংশ মানুষই যাচাই করার অভ্যাস না থাকায় দ্রুতই বিভ্রান্ত হন, মন্তব্য করেন, শেয়ার করেন। ফলে মিথ্যা তথ্যের বিস্তার বহুগুণে বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিকে নয়, রাষ্ট্রকে পর্যন্ত অস্থির করতে পারে। একটি গুজব- হোক তা ধর্ম, রাজনীতি কিংবা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মুহূর্তে মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করে তুলতে পারে। এমন ঘটনা বাংলাদেশ ইতোপূর্বে দেখেছে, এখনও দেখছে।
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা থেকে শুরু করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (উঝঅ) পর্যন্ত বাংলাদেশে অনলাইনে ভুয়া তথ্য প্রচারের জন্য একাধিক সময় কঠোর আইন ছিল। এসব আইনে ভুয়া তথ্য বা প্ররোচনামূলক কনটেন্ট প্রচারের অপরাধে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান ছিল। তবে অভিযোগ উঠেছিল- এই আইনগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ব্যাহত করে এবং অনেক সময় সাংবাদিক ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের অযথা হয়রানি করা হয়। ফলে ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনে আসা হয়, পরে আবার ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে এর বেশ কিছু ধারা বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়। বিশেষত যেসব ধারা কথাবার্তা বা মতামতভিত্তিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো, সেগুলোর বড় অংশ বাতিল হয়েছে।
এর ফলে এখন ভুয়া পোস্ট বা বিভ্রান্তিকর অডিও-ভিডিও শেয়ার করা সবসময়ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে- এমনটা নিশ্চিত নয়। আইন কাঠামো আপাতদৃষ্টিতে শিথিল হয়ে পড়েছে, আর তাই ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণে নীতিগত শূন্যতা স্পষ্ট।
এ অবস্থায় যে শাস্তিযোগ্যতা রয়েছে, তা প্রধানত অন্যান্য বিদ্যমান আইনের ওপর নির্ভরশীল- যেমন মানহানি, প্রতারণা, ব্যক্তি আক্রমণ বা নিরাপত্তা হুমকি। যেখানে স্পষ্ট ক্ষতির প্রমাণ থাকলে মামলা করা সম্ভব। কিন্তু ‘মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাজকে বিভ্রান্ত করা’- এই অপরাধটি এখন অনেকটাই অনির্দিষ্ট অঞ্চলে পড়ে গেছে।
আইনের দুর্বলতা সমাজকে আরো ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে, কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স হতে পারে না। আইন যখন দুর্বল হয়, তখন অপব্যবহার বাড়ে। বিশেষ করে ভুয়া সংবাদ ও ডিপফেক প্রযুক্তির যুগে কঠোর কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণ আইন অত্যন্ত জরুরি। মানুষের সুনাম, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি- সবই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
একটি মাত্র ডিপফেক ভিডিও- যেখানে কণ্ঠ বা মুখ পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে, কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করতে পারে, এমনকি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। আর এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করা এখন খুবই সহজ, যেকোনো কিশোরও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে বানাতে পারে। তাই আইন শিথিল হোক, তবে অকার্যকর না।
আইনের পাশাপাশি শিক্ষা ও সচেতনতা জরুরি : সর্বোচ্চ শক্তিশালী আইন তৈরি করলেও, জনগণ যদি সচেতন না হয়-তাহলে ভুয়া খবর প্রতিরোধ করা যাবে না। সত্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেকোনো ভিডিও দেখে উত্তেজিত না হয়ে যাচাই করা প্রয়োজন- এটি কোথা থেকে এসেছে, এাঁ কার পোস্ট, এর উৎস নির্ভরযোগ্য কি না। মিডিয়া ও স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ‘ডিজিটাল সাক্ষরতা’ বা মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
একই সঙ্গে ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মকেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
ভেরিফিকেশন সিস্টেম শক্তিশালী করা, ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা এবং ডিপফেক শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো- এগুলো এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ যেমন ডিজিটাল সমাজের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে, তেমনই ডিজিটাল অপরাধের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে। আইনের পরিবর্তন হওয়া জরুরি ছিল, তবে নতুন যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে-তা ভুয়া সংবাদ ও বিকৃত কনটেন্ট ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। তাই দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ, সচেতন নাগরিক আচরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সত্য যাচাই- এই তিনের সমন্বয় ছাড়া ফেসবুকের ভুয়া তথ্যের সুনামি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ডিজিটাল স্বাধীনতা প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে চাই ডিজিটাল দায়িত্বও- এটাই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
বিকেপি/এমবি

