জেলখানায় নারী হাজতির অধিকার : আইন ও মানবিকতার প্রশ্ন
বায়েজিদ তাশরীক
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৭
দেশের বিচারব্যবস্থায় “হাজতি” শব্দটি এমন একজন নাগরিককে বোঝায়, যিনি দোষী সাব্যস্ত নন, বরং বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে আটক আছেন। সংবিধানের দৃষ্টিতে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ- যতক্ষণ না আদালত দোষ প্রমাণ করেন। এই মৌলিক নীতির আলোকে নারী হাজতিদের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, আইনগত ও মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলাদেশের জেলখানায় নারী হাজতির অধিকার কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?
আইন কী বলে:
বাংলাদেশে নারী হাজতিদের অধিকার মূলত কয়েকটি আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত-
প্রথমত, বাংলাদেশ সংবিধান। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। হাজতি নারী হওয়া সত্ত্বেও এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, কারা আইন, ১৮৯৪ ও কারা বিধিমালা (ঔধরষ ঈড়ফব)। এসব আইনে নারী বন্দিদের জন্য পৃথক থাকার ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শালীন আচরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, ফৌজদারি কার্যবিধি (ঈৎচঈ)। এই আইনে নারী আসামিকে গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও হাজতে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। সূর্যাস্তের পর গ্রেপ্তার নিষেধাজ্ঞা, নারী পুলিশ দ্বারা তল্লাশি এবং আদালতের অনুমতি ব্যতীত অপ্রয়োজনীয় হেফাজতে না রাখার বিধান রয়েছে।
চতুর্থত, বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর পক্ষভুক্ত- বিশেষ করে ঈঊউঅড ও টহরঃবফ ঘধঃরড়হং ইধহমশড়শ জঁষবং- সেগুলো নারী বন্দিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণের কথা বলে।
নারী হাজতির মৌলিক অধিকারসমূহ
আইন অনুযায়ী একজন নারী হাজতির যেসব অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা-
১. পৃথক ও নিরাপদ আবাসন
নারী হাজতিকে পুরুষ বন্দি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। নারী কারারক্ষী দ্বারা তত্ত্বাবধান এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
২. মানবিক আচরণ ও মর্যাদা
কোনো নারী হাজতিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, অপমানজনক আচরণ কিংবা অমানবিক ব্যবহারের শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ। তিনি একজন বিচারাধীন নাগরিক- অপরাধী নন।
৩. স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষ চিকিৎসা
নারী হাজতিদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা, গর্ভবতী নারী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. সন্তানসহ থাকার অধিকার
বাংলাদেশে নির্দিষ্ট বয়স (সাধারণত ৬ বছর) পর্যন্ত শিশু সন্তান মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিশুর খাদ্য, স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
৫. আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ ও জামিনের সুযোগ
নারী হাজতির আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, পরিবারকে জানানো এবং জামিনের আবেদন করার অধিকার রয়েছে। অযথা হাজতে আটকে রাখা সংবিধান পরিপন্থী।
৬. রিমান্ড ও জিজ্ঞাসাবাদের সুরক্ষা
নারী হাজতিকে রিমান্ডে নিলে নারী পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
আইন যতটা অগ্রসর, বাস্তবতা ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের অনেক কারাগারে এখনও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসা ঘাটতি ও মানসিক সহায়তার অভাব প্রকট। নারী হাজতিদের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও তাদের চাহিদা ভিন্ন ও সংবেদনশীল।
বিশেষ করে দরিদ্র, অশিক্ষিত বা রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া নারী হাজতিরা প্রায়ই আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। অনেক ক্ষেত্রে জামিনযোগ্য অপরাধেও দীর্ঘদিন হাজতে থাকতে দেখা যায়, যা মানবাধিকারের পরিপন্থী।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো-কিছু ক্ষেত্রে নারী হাজতির প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও নেতিবাচক। অপরাধ প্রমাণের আগেই তাকে সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি করে।
কী করা প্রয়োজন
প্রথমত, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইন শুধু কাগজে থাকলে চলবে না, বাস্তব প্রয়োগই মুখ্য। দ্বিতীয়ত, কারা ব্যবস্থায় নারী-বান্ধব সংস্কার জরুরি। নারী ডাক্তার, কাউন্সেলর ও প্রশিক্ষিত নারী কারারক্ষীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, দ্রুত বিচার ও জামিন নীতি কার্যকর করতে হবে, যাতে হাজতি নারী অযথা দীর্ঘদিন কারাগারে না থাকেন। চতুর্থত, স্বচ্ছ নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন—জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা দরকার।
নারী হাজতির অধিকার প্রশ্নটি শুধু কারাগারের দেয়ালের ভেতরের বিষয় নয়- এটি রাষ্ট্রের নৈতিকতা, বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও মানবাধিকারের মানদণ্ডের প্রতিফলন। একজন নারী হাজতি অপরাধী নন; তিনি বিচারাধীন একজন নাগরিক। তাঁর প্রতি আচরণে রাষ্ট্রের মানবিক চেহারা ফুটে ওঠে।
আইনের শাসন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার সর্বাগ্রে সুরক্ষিত হয়। বাংলাদেশের জেলখানায় নারী হাজতির অধিকার নিশ্চিত করা তাই কোনো দয়া নয়- এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও মানবিক দায়িত্ব।
বিকেপি/এমবি

