Logo

আইন ও বিচার

ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত, আইন কী বলে

Icon

ডা. মমতাজ বেগম

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:০৬

ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত, আইন কী বলে

গর্ভপাত একটি সংবেদনশীল বিষয়- এতে জড়িয়ে আছে নারীস্বাস্থ্য, পরিবার, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের আইন। বাংলাদেশে গর্ভপাতকে ঘিরে নানা ভুল ধারণা ও গোপন বাস্তবতা বিদ্যমান। অনেকেই মনে করেন এটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত; আবার কেউ কেউ ভাবেন, স্বামীর সম্মতি থাকলেই তা বৈধ। বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত সাধারণভাবে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রশ্ন হলো, এই অপরাধের জন্য কার শাস্তি হয়—স্ত্রী, স্বামী, নাকি উভয়ের? আইন কী বলছে, আর সমাজের দায় কোথায়?

আইনগত কাঠামো: দণ্ডবিধির স্পষ্ট বিধান

বাংলাদেশে গর্ভপাত সংক্রান্ত অপরাধের মূল আইন হলো বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০। এর ৩১২ থেকে ৩১৬ ধারায় গর্ভপাত ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে।

ধারা ৩১২ অনুযায়ী, যদি কোনো নারী নিজে ইচ্ছাকৃতভাবে গর্ভপাত ঘটান, অথবা অন্য কেউ তার সম্মতিতে গর্ভপাত ঘটায়, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি হলো তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে- নারীর জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে সৎ বিশ্বাসে চিকিৎসক কর্তৃক গর্ভপাত ঘটানো হলে তা অপরাধ নয়।

স্ত্রী (গর্ভবতী নারী) কি অপরাধী? :

আইনের দৃষ্টিতে, গর্ভবতী নারী নিজে ইচ্ছাকৃতভাবে গর্ভপাত ঘটালে তিনি অপরাধী হিসেবে গণ্য হতে পারেন- যদি তা জীবন রক্ষার জন্য না হয়। অর্থাৎ, সামাজিক চাপ, পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তিগত ইচ্ছার কারণে গর্ভপাত ঘটানো হলে আইন তাকে দায়মুক্তি দেয় না।

তবে বাস্তবে আদালত শাস্তি নির্ধারণের সময় নারীর শারীরিক অবস্থা, মানসিক চাপ, পারিপার্শ্বিকতা ও বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নেন। তবু আইনি সত্য হলো- আইন নারীকে পুরোপুরি অব্যাহতি দেয় না।

স্বামীর দায় ও শাস্তি

স্বামী যদি গর্ভপাতের জন্য উসকানি দেন, চাপ প্রয়োগ করেন, অর্থ জোগান দেন, বা সরাসরি এতে অংশ নেন, তাহলে তিনি সমানভাবে অপরাধী হবেন। দণ্ডবিধির সাধারণ নীতিমতে, অপরাধে সহায়তা, প্ররোচনা বা ষড়যন্ত্র করলেও শাস্তিযোগ্য দায় তৈরি হয়।

অর্থাৎ স্বামী যদি স্ত্রীকে জোর করে বা প্ররোচিত করে গর্ভপাত করান, অবৈধ কিদ্বনিক বা ব্যক্তির কাছে নিয়ে যান, বা চিকিৎসকের সঙ্গে চুক্তি করেন, তাহলে তিনি অপরাধে সহযোগী হিসেবে একই শাস্তির আওতায় পড়তে পারেন।

চিকিৎসক বা তৃতীয় পক্ষের দায়

যিনি গর্ভপাত ঘটান—চিকিৎসক হোন বা অন্য কেউ- তার দায় আরও গুরুতর। ধারা ৩১৩ অনুযায়ী, যদি নারীর সম্মতি ছাড়াই গর্ভপাত ঘটানো হয়, তাহলে শাস্তি হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড।

আর যদি গর্ভপাতের ফলে নারীর মৃত্যু ঘটে, তবে ধারা ৩১৪ ও ৩১৬ অনুযায়ী শাস্তি আরও কঠোর হয়- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

“জীবন রক্ষার প্রয়োজনে” ব্যতিক্রম

আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- নারীর জীবন বাঁচাতে সৎ বিশ্বাসে করা গর্ভপাত অপরাধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন গর্ভধারণ নারীর প্রাণের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করে, তখন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক কর্তৃক গর্ভপাত আইনসম্মত হতে পারে।

এছাড়া বাংলাদেশে মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশন (গজ) নামে একটি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম রয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (সাধারণত ৮-১০ সপ্তাহ) চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় করা হয়। এটি দণ্ডবিধির গর্ভপাত সংজ্ঞার বাইরে থেকে স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। তবে এই ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

আইন একদিকে কঠোর, অন্যদিকে বাস্তবতা ভিন্ন। অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ, দারিদ্র্য, সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক চাপের কারণে অনেক নারী গোপনে অবৈধ গর্ভপাতের পথে যান। এতে ঝুঁকি বাড়ে, জীবন বিপন্ন হয়, আর আইনগত সুরক্ষা থাকে না।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে- আইনের কঠোরতা কি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, নাকি তাকে আরও ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, তবে আলোচনাটি জরুরি।

কী করা প্রয়োজন : 

প্রথমত, আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে- স্ত্রী ও স্বামী উভয়কেই জানতে হবে কোনটি অপরাধ, কোনটি ব্যতিক্রম।

দ্বিতীয়ত, নারীস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে, যাতে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ কমে।

তৃতীয়ত, স্বামীর দায়বদ্ধতা সামাজিক ও আইনি উভয় পর্যায়ে জোরদার করা দরকার। গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত একতরফা নয়-এর দায় যৌথ।

দেশের আইনে ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত সাধারণত অপরাধ। স্ত্রী নিজে করলেও, স্বামী প্ররোচনা দিলেও, কিংবা তৃতীয় কেউ ঘটালেও আইন দায় নির্ধারণ করে। তবে একই সঙ্গে আইন মানবিক ব্যতিক্রমও স্বীকার করে, যখন নারীর জীবন রক্ষাই মুখ্য।

এই বিষয়টি কেবল শাস্তির নয়; এটি সচেতনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। কঠোর আইন ও মানবিক বাস্তবতার মাঝে ভারসাম্য তৈরি করাই সময়ের দাবি—যাতে নারী নিরাপদ থাকে, পরিবার সচেতন হয়, আর আইন তার ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর