জনসম্মুখে হত্যার স্বীকারোক্তি ও দণ্ডবিধির অবস্থান
আইন ও আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১০
সাম্প্রতিক সময়ে জনসম্মুখে হত্যার স্বীকারোক্তির ঘটনা সমাজে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জনসভা কিংবা গণমাধ্যমের সামনে কেউ যখন নিজেকে হত্যার জন্য দায়ী বলে স্বীকার করে, তখন জনমনে প্রশ্ন জাগে- এতে কি আইনগতভাবে শাস্তি নিশ্চিত হয়? দণ্ডবিধি কি এ ধরনের স্বীকারোক্তিকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে?
দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০২ ধারা অনুযায়ী, হত্যা একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পাশাপাশি অর্থদণ্ডও আরোপ হতে পারে। এখানে লক্ষণীয় যে, অপরাধের শাস্তি নির্ধারণে অপরাধের প্রকৃতি বিবেচ্য-স্বীকারোক্তি কোথায় বা কীভাবে দেওয়া হয়েছে, তা নয়।
আইন অনুযায়ী, জনসম্মুখে বা গণমাধ্যমে দেওয়া স্বীকারোক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী (CrPC ধারা ১৬৪), কেবলমাত্র ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বেচ্ছায় ও আইনসম্মতভাবে দেওয়া স্বীকারোক্তিই আদালতে গ্রহণযোগ্য। জনসম্মুখে দেওয়া স্বীকারোক্তিকে আইনের ভাষায় বলা হয় extrajudicial confession, যা আদালত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে এবং সাধারণত একে একক প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট ধরা হয় না।
তবে স্বীকারোক্তি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীনও নয়। এটি তদন্তের সহায়ক হতে পারে এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিললে মামলার গতিপথ প্রভাবিত করতে পারে। আবার বিচার পর্যায়ে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি কখনো কখনো শাস্তি লঘুকরণে (mitigating factor) বিবেচিত হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণই আদালতের বিবেচনার বিষয়। এই বাস্তবতায় স্পষ্ট হয় যে, আইন আবেগের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণ ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে চলে।
জনরোষ বা সামাজিক চাপের কাছে নত হয়ে বিচার হওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আবেগী প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সংবিধানসম্মত বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিই আমাদের আস্থা রাখতে হবে। আইনের চোখে অপরাধী অপরাধের জন্য দণ্ডিত হবে- সে স্বীকার করুক বা না করুক- কন্তু সেই দণ্ড নিশ্চিত হবে কেবল যথাযথ বিচার ও প্রমাণের ভিত্তিতে। এটাই সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয়।
বিকেপি/আইএইচ

