জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ; নিরাপত্তার আড়ালে আইনি ঝুঁকি
আইন ও আদালত ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫২
দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ কার্যক্রম এখন আর শুধু অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয় নয়; এটি সরাসরি নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার, আইনি নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে জমি বা ভবন বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে।
ব্যবসা সম্প্রসারণ, শিল্প স্থাপন কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যাংক ঋণ এখন অনেকের কাছে একমাত্র ভরসা। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে জমি বন্ধক রাখার আইনি দিক সম্পর্কে ঋণগ্রহীতারা কতটা সচেতন? বাস্তবতা হলো, সচেতনতার অভাবেই অনেক পরিবার সর্বশাান্ত হচ্ছে।
ব্যাংক ঋণ ও জমি বন্ধক: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমি বন্ধক একটি স্বীকৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ব্যাংক ঋণ প্রদান করে ঝুঁকি কমাতে চায়, আর ঋণগ্রহীতা চায় সহজ শর্তে বড় অঙ্কের অর্থ। এই পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতেই জমি বন্ধক ব্যবস্থা চালু। কিন্তু এখানে সামান্য অসতর্কতা ঋণগ্রহীতাকে নিয়ে যেতে পারে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সম্পত্তি হারানোর পথে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় জমি শুধুই সম্পত্তি নয়; এটি পারিবারিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আশ্রয়। সেই জমি যদি অজ্ঞতাবশত বন্ধক রেখে হারিয়ে যায়, তার সামাজিক প্রভাব মারাত্মক।
আইন কী বলে: বন্ধকের আইনি ভিত্তি
বাংলাদেশে জমি বন্ধক সংক্রান্ত মূল আইন হলো Transfer of Property Act, ১৮৮২। এই আইনের ৫৮ ধারায় বন্ধকের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ স্পষ্ট করা হয়েছে। এর পাশাপাশি কার্যকর রয়েছে-
Registration Act, 1908, Contract Act, 1872, Artha Rin Adalat Ain, 2003, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন ও সার্কুলার আইন অনুযায়ী, বন্ধক তখনই বৈধ হবে যখন বন্ধকদাতা প্রকৃত মালিক হবেন এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
বন্ধকের ধরণ ও ব্যাংকের কৌশল :
বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো সাধারণত তিন ধরনের বন্ধক গ্রহণ করে-
নিবন্ধিত বন্ধক (Registered Mortgage), ইকুইটেবল মর্টগেজ (Equitable Mortgage বা দলিল জমা বন্ধক), সিম্পল মর্টগেজ।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় Equitable Mortgage, যেখানে রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই মূল দলিল ব্যাংকের কাছে জমা রাখা হয়। এতে খরচ কম হলেও ঝুঁকি বেশি, কারণ অনেক ঋণগ্রহীতা মনে করেন, রেজিস্ট্রি হয়নি মানে জমি বিক্রি হবে না। বাস্তবে এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা।
ঋণগ্রহীতার অধিকার : যা অনেকেই জানেন না। আইন ঋণগ্রহীতাকে পুরোপুরি অসহায় করে রাখেনি। আইন অনুযায়ী-
- ঋণ পরিশোধের পর বন্ধকী জমির মূল দলিল ফেরত পাওয়া ঋণগ্রহীতার আইনগত অধিকার।
- ব্যাংক আদালতের আদেশ ছাড়া জোরপূর্বক দখল নিতে পারে না।
- নিলামের আগে যথাযথ নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক।
- ঋণগ্রহীতা চাইলে আদালতে আপত্তি ও পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা এসব অধিকার জানেন না কিংবা জানলেও আইনি সহায়তা নিতে ভয় পান।
ব্যাংকের ক্ষমতা ও সীমা : Artha Rin Adalat Ain, ২০০৩ ব্যাংককে ঋণ আদায়ের জন্য শক্তিশালী ক্ষমতা দিয়েছে। খেলাপি হলে-
- ব্যাংক মামলা করতে পারে,
- আদালতের মাধ্যমে বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে তুলতে পারে,
- গ্যারান্টরদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়।
- আদালতের অনুমতি ব্যতীত ব্যাংক কোনো সম্পত্তি বিক্রি বা দখল করতে পারে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে না, ফলে আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
গ্যারান্টর : নীরব ফাঁদ
বাংলাদেশে আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো- গ্যারান্টর হওয়া। অনেকেই আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের খাতিরে গ্যারান্টর হন, কিন্তু জানেন না যে আইনের চোখে গ্যারান্টরও সমান দায়ী। ঋণ খেলাপি হলে গ্যারান্টরের জমি, ব্যাংক হিসাব এমনকি ব্যক্তিগত সম্পত্তিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
প্রতারণা ও জালিয়াতির আশঙ্কা :
জমি বন্ধক সংক্রান্ত আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো জাল দলিল, এক জমি একাধিক ব্যাংকে বন্ধক, উত্তরাধিকার জটিলতা গোপন করা। এসব কারণে শুধু ঋণগ্রহীতা নয়, ব্যাংকিং খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারীর ওপরই চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা :
বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছে-
- যথাযথ জমি যাচাই ছাড়া ঋণ না দিতে,
- লিগ্যাল ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করতে,
- গ্রাহকের অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে, তবে মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনার বাস্তবায়ন এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
সুশাসন নিশ্চিত করতে করণীয় :
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি-
- ঋণ গ্রহণের আগে স্বাধীন আইনজীবীর মতামত গ্রহণ,
- বন্ধক ও ঋণ চুক্তির প্রতিটি ধারা বোঝা,
- ব্যাংক কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা,
- আর্থ ঋণ আদালতের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও মানবিক করা।
জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ কোনো অপরাধ নয়; এটি আধুনিক অর্থনীতির বাস্তবতা। কিন্তু আইন না জেনে এই পথে পা বাড়ানো মানে নিজের সম্পত্তি নিজেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। ঋণগ্রহীতার সচেতনতা, ব্যাংকের দায়িত্বশীলতা ও আইনের সুশাসন- এই তিনের সমন্বয় না হলে জমি বন্ধক ব্যবস্থা উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে সর্বনাশের ফাঁদে পরিণত হবে। এখনই সময়, এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
বিকেপি/এনএ

