Logo

আইন ও বিচার

নির্বাচনী আচরণবিধি : জরিমানার গণ্ডি পেরিয়ে কঠোরতার সময়

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৮

নির্বাচনী আচরণবিধি : জরিমানার গণ্ডি পেরিয়ে কঠোরতার সময়

নির্বাচন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। আর সেই নির্বাচনের স্বচ্ছতা, গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাচনী আচরণবিধির ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে- আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায় আজও মূলত নামমাত্র জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে আইন ভঙ্গের প্রবণতা কমার বদলে দিন দিন যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

নির্বাচনের সময় পোস্টার-ব্যানার ছেঁড়া, অনুমোদনহীন প্রচার, শোডাউন, সরকারি সুবিধার অপব্যবহার, ভোটারকে প্রভাবিত করার নানা কৌশল-এসবই এখন যেন ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অথচ এসব আচরণ সরাসরি নির্বাচনের সমতা ও ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দুঃখজনক হলো, এসব গুরুতর লঙ্ঘনের পরও দায় শেষ হয় কয়েক হাজার টাকা জরিমানা দিয়েই।

বর্তমান নির্বাচনী আচরণবিধিতে অধিকাংশ অপরাধের শাস্তি অর্থদণ্ডে সীমাবদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে সেই জরিমানার পরিমাণ এতই সামান্য যে প্রার্থীদের কাছে তা কোনো শাস্তিই মনে হয় না। বরং অনেকেই এটিকে নির্বাচনী ব্যয়ের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই ধরে নেন।

এই বাস্তবতায় আচরণবিধি লঙ্ঘন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রভাবশালী প্রার্থী ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো জানে- আইন ভাঙলেও বড় কোনো ঝুঁকি নেই। ফলে আইনের প্রতি ভয় বা সম্মান- দুটোই হারিয়ে যাচ্ছে।

সমস্যার বাস্তবতা হলো, দুটোই। একদিকে আচরণবিধির শাস্তিমূলক ধারাগুলো দুর্বল ও যুগোপযোগী নয়; অন্যদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও দৃঢ় ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত কিংবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি থাকলেও প্রভাবশালী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় অনীহা। ফলে সাধারণ ভোটারের মনে জন্ম নিচ্ছে এক ধরনের হতাশা ও অনাস্থা- আইন আছে, কিন্তু সবার জন্য সমান নয়।

নির্বাচনী আচরণবিধি সম্পর্কে প্রার্থীদের অজ্ঞতা নেই- বরং তারা জানেন কোথায় কীভাবে আইন ভাঙলে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া যাবে। প্রকৃত সমস্যা চেতনতার অভাব নয়; সমস্যা দায়বদ্ধতার অভাব।

যেখানে আইন ভাঙার পরও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার অক্ষত থাকে, সেখানে আচরণবিধি মানার নৈতিক তাগিদ কীভাবে তৈরি হবে? নির্বাচন কমিশনের সতর্কবার্তা কিংবা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন তখন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

কঠোর আইন ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব

এ কথা এখন স্পষ্ট- নির্বাচনী আচরণবিধিকে কার্যকর করতে হলে জরিমানার গণ্ডি পেরিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজন- গুরুতর লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান, পুনরাবৃত্ত অপরাধে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার সুযোগ, সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহারে ফৌজদারি দায়, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, আইন যত কঠোর হবে, ভয়ের চেয়ে বড় হবে শৃঙ্খলা। আর শৃঙ্খলাই পারে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা জরুরি

নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার ক্ষমতা যদি কেবল নোটিশ আর জরিমানায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই ক্ষমতা কার্যত প্রতীকী হয়ে যায়। কমিশনের হাতে বাস্তব ও দৃশ্যমান শাস্তির ক্ষমতা না থাকলে আচরণবিধি মানানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবেই।

কমিশনের উচিত আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করা এবং রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

নির্বাচনী আচরণবিধি কোনো শোভামাত্রিক নীতিমালা নয়; এটি গণতন্ত্র রক্ষার একটি মৌলিক হাতিয়ার। অথচ জরিমানাকেন্দ্রিক দুর্বল আইন এই আচরণবিধিকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে। সময় এসেছে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি সংস্কারের।

সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলে শুধু স্লোগান নয়, প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত। আচরণবিধি লঙ্ঘন যদি অপরাধ হয়, তবে তার শাস্তিও হতে হবে অপরাধের মতোই। নইলে নির্বাচন থাকবে কাগজে, আর গণতন্ত্র হারাবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত সংসদ নির্বাচন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর