জাতীয় পতাকাবাহী বিমান : সুবিধা, দায়বদ্ধতা ও প্রত্যাশা
বায়েজিদ তাশরীক
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৬
দেশের আকাশপথের ইতিহাসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স শুধু একটি পরিবহন সংস্থা নয়, এটি জাতির মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত এই জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি আজ দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে সুবিধা ও সেবার পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
যাত্রীসেবায় বিমানের সুবিধা
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও জাতীয় দায়বদ্ধতা। জরুরি সময়ে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, মহামারি কিংবা প্রবাসী নাগরিকদের প্রত্যাবাসনে বিমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোভিড-১৯ মহামারির সময় আটকে পড়া হাজারো বাংলাদেশিকে দেশে ফেরাতে বিমানের বিশেষ ফ্লাইট ছিল প্রশংসনীয়।
যাত্রীদের জন্য বিমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হচ্ছে-
তুলনামূলকভাবে সহনীয় ভাড়া, ৩০-৪০ কেজি লাগেজ সুবিধা (বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ রুটে), প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলা ভাষাভিত্তিক সেবা ও খাবার, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের যাত্রীদের কাছে এই সুবিধাগুলো বিমানের প্রতি আস্থার কারণ।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ভূমিকা
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ঢাকা থেকে সরাসরি লন্ডন, টরন্টো, রোম, জেদ্দা, রিয়াদ, কুয়ালালামপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটে সংযোগ দেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সুবিধা। এছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে- চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট দেশের পর্যটন ও বাণিজ্যে অবদান রাখছে। সাম্প্রতিক বছরে বিমানের বহরে যুক্ত হয়েছে আধুনিক বোয়িং ড্রিমলাইনারসহ নতুন উড়োজাহাজ। এতে জ্বালানি সাশ্রয়, যাত্রী নিরাপত্তা ও আরাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল টিকিটিং, অনলাইন চেক-ইন ও ফ্লাইট ট্র্যাকিং সেবাও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।
তবে সুবিধার পাশাপাশি বিমানের কিছু দীর্ঘদিনের সমস্যাও রয়েছে। সময়ানুবর্তিতার অভাব, ফ্লাইট বিলম্ব, হঠাৎ সময়সূচি পরিবর্তন, গ্রাহক সেবার দুর্বলতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ধীরগতির অভিযোগ যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
এছাড়া পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, লোকসানের ইতিহাস, দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার বিষয়গুলো বারবার আলোচনায় আসে।
করণীয় ও প্রত্যাশা
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা হিসেবে বিমানের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। এজন্য প্রয়োজন- পেশাদার ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, যাত্রীবান্ধব নীতিমালা, সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিতকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের গ্রাহকসেবা, সরকারি মালিকানার অজুহাতে অব্যবস্থাপনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং জাতীয় স্বার্থে বিমানকে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই সময়ের দাবি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সুবিধা ও অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার আন্তরিক উদ্যোগই পারে বিমানকে সত্যিকার অর্থে একটি আধুনিক, বিশ্বমানের জাতীয় এয়ারলাইন্সে পরিণত করতে। জাতীয় গর্বের এই বাহনকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সুশাসন, জবাবদিহি ও যাত্রীকেন্দ্রিক সংস্থা।
বিকেপি/এমএইচএস

