Logo

আইন ও বিচার

বিয়ে না করে একসঙ্গে থাকা : বাংলাদেশে আইন কীভাবে দেখে?

Icon

সোমা কবীর

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫০

বিয়ে না করে একসঙ্গে থাকা : বাংলাদেশে আইন কীভাবে দেখে?

প্রতীকী ছবি

সম্পর্ক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার আলোচনায় আজ ‘লিভ-ইন’ কিংবা ‘একসঙ্গে থাকা’ (Live-together/Cohabitation) বিষয়টি বিশ্বব্যাপী বৈচিত্র্যময় প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন। কয়েকটি দেশে এটি আইনি স্বীকৃতি ও নির্দিষ্ট অধিকার পেয়েছে, আবার বহু দেশে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথার কারণে তা বিতর্কিত। বাংলাদেশেও এই ইস্যু বিষ্ময়করভাবে আইনের অন্তর্গত নয়, কিন্তু মোটেও নিষিদ্ধও নয়, বিশেষ কোনো আইন সরাসরি “লিভ-ইন সম্পর্ক” নিষিদ্ধ করে না এবং সরাসরি আইনি স্বীকৃতি দেয় না। এমনকি অভিজ্ঞ আইনজ্ঞরা মানে, এক-সঙ্গে থাকা বা যৌথ বসবাসকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার উপায় বর্তমানে আইনগতভাবে নেই।

তবে এই ‘আইনের অনুপস্থিতি’ অনেক ভুল ধারণা এবং বাস্তবে বিপজ্জনক গ্যাপ সৃষ্টি করেছে। আইনের অস্পষ্টতা মানে স্ব-অধিকার নয় বরং এটি সংকট ও অসুরক্ষা তৈরি করে, বিশেষত নারী ও শিশুর জন্য।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে সমান অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও জীবন যাপনের স্বাধীনতা দেয়। তবে সেই স্বাধীনতা “সমস্ত সম্পর্কের আইনি সমানতা” স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করে না।

কেন? কারণ বাংলাদেশে পরিবার, বৈবাহিক সম্পর্ক ও সন্তানদের আইনি স্বীকৃতি মূলত বিবাহ ভিত্তিক। ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত আইন (Muslim Family Laws, Hindu Marriage Laws ইত্যাদি) এবং ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামো বিবাহকে সম্পর্কের আইনি ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে। লিভ-ইন সম্পর্ক একত্রে থাকা রুলস বা বিশেষ আইনে স্বীকৃত নয।

এই পরিস্থিতি ‘আইনের অনুপস্থিতি’ এবং ‘আইনগত স্বীকৃতির অভাব’- দুটি আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে সাধারণ আইন বা দন্ডবিধি “লিভ-ইন সম্পর্ক” বা একসঙ্গে বসবাসকে সরাসরি অপরাধ আখ্যায়িত করেনি, তবে এটি কোন সম্পর্ককে বৈধতা দেয় বা তার অধিকার সুরক্ষিত করে- সে রকম কোনো ধারা নেই। 

অপরিচিত সম্পর্ক বনাম আইনগত সুরক্ষা
আইনের এই গ্যাপের ফলাফল হলো তৎক্ষণিক আইনগত অসমর্থন

লিভ-ইন সম্পর্ককে আদালত বা আইন স্বীকৃতি দেয় না- ভোগ্যসেবা, ভাড়া, সম্পত্তি দাবি, উত্তরাধিকারের মতো অধিকারগুলো বিবাহিত দম্পতিদের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয় না। এটি ‘সরকারি স্বীকৃতি নেই’- এটাই বাস্তব। 

যদিও বাংলাদেশে দন্ডবিধির ৪৯৩ ধারার মতো কিছু বিধান রয়েছে যা ‘বিবাহহীন সহবাসে প্রতারণা করে সহবাস’ (বিবাহ করা হয়েছে বলে প্রতারণা করা) মামলা আনার সুযোগ দেয়, এটি সম্পর্কের সমর্থন নয় বরং প্রতারণার শাস্তি।

সামাজিক নৈতিকতা বনাম আইন
আইন যদি নির্দিষ্ট কিছু নিষিদ্ধ না করে, অর্থ এটা নয় যে তা সমর্থন করে। বাংলাদেশে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রচলন বিবাহকে কেন্দ্রে রাখে, এ কারণে লিভ-ইন সম্পর্ক প্রথাগতভাবে স্বীকৃত নয় এবং আইনি সুরক্ষা পেতে কোর্টে চাপ সহ অন্যান্য প্রমাণপ্রক্রিয়াই জটিল। 

অনেকেই মনে করেন যদি কোনো যুগল দীর্ঘদিন একসাথে থাকে, তা আইনি দৃষ্টিতে ‘সম্বন্ধের প্রকৃতি বিবাহের মতো’ হয়ে যাবে। বাস্তবে বাংলাদেশের আইনে এমন কোনো স্বীকৃতি নেই- কোনো সময়কাল বা সম্পর্কের প্রকৃতির ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘আইনি দম্পতি’ হিসেবে গণ্য করা হয় না। শিশুদের আইনগত মর্যাদা, উত্তরাধিকার, সহবাসের ঠিকানা বা আবাসের অধিকার-  এগুলোকে বিবাহের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হয়।

ফলশ্রুতিতে লিভ-ইন সম্পর্ক কোনো চার্জশিটে স্বীকৃত ‘স্বামী/স্ত্রী’ হিসাবে গণ্য হয় না

সন্তানদের জম্মনোটা সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে। উত্তরাধিকারের আইন বহু ক্ষেত্রে ধারা অনুযায়ী প্রয়োগ হয় না। এই দিকগুলো আইনগতভাবে স্পষ্ট না হওয়ার কারণে যুগলরা ন্যায়বিচারের বাইরে পড়ে যায়।

অভিজ্ঞতা ও আদালতের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশে সরাসরি লিভ-ইন সম্পর্কের রায় নেই কিন্তু ভারতীয় বা অন্যান্য দেশগুলোর আদালত সিদ্ধান্ত থেকে একটি তুলনামূলক মানসিকতা দেখা যায়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে যুক্তি দিয়েছে যে প্রাপ্তবয়স্করা একসঙ্গে থাকতে পারেন ও তা স্বতঃসিদ্ধভাবে অপরাধ নয়, তবে তা “বিবাহের মতো” অর্থ উপার্জন বা স্বীকৃতি পায় না বরং সামাজিক অধিকার মাত্র। 

যদিও বাংলাদেশে একই রকম আদালতি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, এই আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি আইনগত উদাহরণ হিসেবে আমাদের সামনে এসেছে- যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার নীতিকে কেন্দ্র করে মিলিত সম্পর্ককে কোনভাবে অপরাধ বলে দেখবে না। 

সহবাসের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য আইন এবং ঝুঁকি
আইনের অনুপস্থিতি অর্থহীনতা নয়- অনেক সময় এটি ঝুঁকি ও ব্যবধান সৃষ্টি করে। কিছু বিধান যেমন দন্ডবিধির ১৩০/৪৯৩ ধারাসমূহ-  প্রতারণা করে সহবাস, সাধারণ অপশিষ্ট আচরণ/অশ্লীলতা, সংক্রান্ত ধারা- সামাজিক নৈতিকতার ভিত্তিতে অভিযোগ তুলে কোর্টে যাওয়া যায়। এর ফলে যুগলদের নামে কোনও পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেশীর অভিযোগ, বা সামাজিক নৈতিকতা ভঙ্গের অভিযোগে আইনি ঝামেলা হতে পারে, এটা পজিটিভ ট্রান্সফার নয় বরং প্রতিনিধি সমস্যার সৃষ্টি। 

আইনি সংস্কারের প্রয়োজন : কেন ও কীভাবে?
স্বাধীনতা থাকলেও সেটা আইন দ্বারা স্বীকৃত নয়- এটা নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, আইনগত সমস্যা। নিরাপত্তার অভাব- যুগলের ভাড়া বা আবাসিক চুক্তি, ব্যাংক বা সরকারি নথি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে আইনগত নিরাপত্তার অভাব আছে। 

সন্তান ও উত্তরাধিকার- টোকেনিক্যালভাবে সন্তানদের আইনি মর্যাদা নির্ধারণে বিবাহকে ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়- এটি অনেক ক্ষেত্রে নিরাশার কারণ। 

‘লিভ-ইন সম্পর্ক’ বা বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে থাকা- বাংলাদেশের আইন এখন তা সরাসরি অপছন্দ করে না, নেই বলে নিষিদ্ধও করে না। কিন্তু তার স্বীকৃতি বা নিরাপত্তা কোনোভাবেই সংরক্ষিত নয়। আইনগত অস্পষ্টতা বোঝায় যে সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল্যবোধ এখনও এটিকে বৈধ সম্পর্কের সমমানের মর্যাদা দিতে প্রস্তুত নয়।

আইন না থাকলে সম্পর্কটি স্বৈরভাবে গতিবেগ পায় না- এটি শুধু ব্যক্তিগত বাছাই নয়, এটি আইনগত অসমর্থিত সম্পর্ক। রাষ্ট্র ও আইন যদি ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সমতা নিশ্চিত করতে চায় তবে এই বিষয়ে আইনি সংস্কার ও বিস্তারিত বিধান তৈরি করা সময়ের দাবি।

আইন এমন হওয়া উচিত যা নাগরিকের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়, সমাজের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করে না এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে- এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির দাবি। 

বিকেপি/এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর