Logo

আইন ও বিচার

গাড়ি রিকুইজিশন : আইনগত ক্ষমতা নাকি হয়রানি

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৬

গাড়ি রিকুইজিশন : আইনগত ক্ষমতা নাকি হয়রানি

নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় সফর, জরুরি প্রশাসনিক কার্যক্রম কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ- এই সব উপলক্ষ্যে প্রায়ই “রিকুইজিশন” শব্দটি শোনা যায়। বিশেষ করে সড়কে চলাচলরত বাস, মাইক্রোবাস, ট্রাক বা প্রাইভেটকার হঠাৎ থামিয়ে পুলিশ যখন বলে, “গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়েছে”, তখন প্রশ্ন জাগে- সরকারের কি যেকোনো সময়, যেকোনো গাড়ি জোরপূর্বক নেওয়ার ক্ষমতা আছে? নাকি রিকুইজিশনের নামে আইনের অপব্যবহার করে যানবাহনের মালিক ও শ্রমিকদের হয়রানি করা হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে আইন ও বাস্তবতার মাঝামাঝি সেই ধূসর এলাকায়, যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আর নাগরিক অধিকারের সংঘর্ষ ঘটে।

রিকুইজিশন কী?

রিকুইজিশন বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদ সাময়িকভাবে অধিগ্রহণ বা ব্যবহার করা। এটি স্থায়ী অধিগ্রহণ নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ব্যবহার। রিকুইজিশন শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে জোরজবরদস্তির ধারণা তৈরি হলেও, আইন অনুযায়ী এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও সীমিত ক্ষমতা, যা নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে প্রয়োগযোগ্য।

বাংলাদেশে গাড়ি বা যানবাহন রিকুইজিশনের বিষয়টি একক কোনো আইনে নয়; বরং একাধিক আইনের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়।

সংবিধানের দৃষ্টিভঙ্গি 

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের সম্পত্তির অধিকার স্বীকৃতি দিয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র জনস্বার্থে আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পত্তি অধিগ্রহণ বা ব্যবহার করতে পারে এবং এর জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ, আইন ছাড়া কিংবা ক্ষতিপূরণ ছাড়া কোনো সম্পত্তি নেওয়া সাংবিধানিকভাবে বৈধ নয়।

জরুরি ক্ষমতা ও বিশেষ আইন 

রিকুইজিশনের ক্ষমতা সাধারণত প্রয়োগ হয়- জরুরি অবস্থা, দুর্যোগকাল, নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক প্রয়োজন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। এক্ষেত্রে সরকার বিশেষ আদেশ বা প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্দিষ্ট শ্রেণির যানবাহন রিকুইজিশনের নির্দেশ দিতে পারে।কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-  এই ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ, মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে নয়। 

পুলিশ আইন ও ক্ষমতার সীমা

পুলিশ আইন, ১৮৬১ অনুযায়ী পুলিশের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। তবে এই আইনে কোথাও বলা নেই যে, পুলিশ ইচ্ছামতো ব্যক্তিগত যানবাহন রিকুইজিশন করতে পারবে। পুলিশ কেবলমাত্র সরকারি আদেশ বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ, আদেশদাতা নয়। অর্থাৎ লিখিত সরকারি আদেশ ছাড়া, নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া, কোনো গাড়ি রিকুইজিশন করা, আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

রিকুইজেশন নামে হয়রানি 

আইন এক কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রায়ই দেখা যায়, সড়কে চলন্ত বাস বা মাইক্রোবাস থামিয়ে নেওয়া, মালিক বা চালককে কোনো লিখিত আদেশ না দেখানো, ক্ষতিপূরণের কথা না বলা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দিনভর গাড়ি আটকে রাখা। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গাড়ির মালিক, চালক ও সহকারী, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। এটি কার্যত আইনগত রিকুইজিশন নয়, প্রশাসনিক জবরদখল।

গাড়ি রিকুইজিশনের নামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন  চালক, হেলপার, পরিবহন শ্রমিক, তাদের দৈনিক আয় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে  খাবার বা বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয় না, দায়িত্ব শেষে কোনো লিখিত কাগজ বা ক্ষতিপূরণ মেলে না, ক্ষয়ক্ষতি বা দুর্ঘটনার দায় শ্রমিকের ঘাড়ে চাপানো হয়। এটি শ্রম অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ক্ষতিপূরণ : আইনে আছে, বাস্তবে নেই 

আইন ও সাংবিধানিক নীতিমালা অনুযায়ী- রিকুইজিশন করা হলে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রদান বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন হলো ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে কে? কখন ও কীভাবে তা প্রদান করা হয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মালিক ও শ্রমিকরা জানেন না-

কোথায় আবেদন করবেন, কাকে জানাবেন, কিংবা আদৌ ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে কি না।

রিকুইজিশন বনাম জবরদখল 

সূ² কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বৈধ রিকুইজিশন, অবৈধ হয়রানি, লিখিত সরকারি আদেশ, মৌখিক নির্দেশ, নির্দিষ্ট সময়সীমা, অনির্দিষ্ট সময়, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত, ক্ষতিপূরণ অনিশ্চিত, আইনি দায়িত্ব স্পষ্ট, দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলেই রিকুইজিশন পরিণত হয় হয়রানিতে।

রিকুইজিশনের নামে গাড়ি জোরপূর্বক নেওয়া কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি- সম্পত্তির অধিকারের লঙ্ঘন, শ্রম অধিকারের লঙ্ঘন, আইনের শাসনের পরিপন্থী, রাষ্ট্র যদি আইনের সীমা অতিক্রম করে। নাগরিকের সম্পত্তি ব্যবহার করে, তাহলে সেই রাষ্ট্র নিজেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

ক্ষমতা থাকুক, স্বেচ্ছাচার নয়। গাড়ি রিকুইজিশন প্রয়োজন হতে পারেএটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে তা হতে হবে স্পষ্ট আইন ও বিধিমালার আওতায়, লিখিত আদেশ ও সময়সীমা নির্ধারণসহ ক্ষতিপূরণ প্রদানের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করে। পুলিশের ভূমিকা হবে আদেশ বাস্তবায়নকারী, মালিক নয়। গাড়ি রিকুইজিশন রাষ্ট্রের একটি ব্যতিক্রমী ক্ষমতা- 

এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সুবিধা নয়। এই ক্ষমতার অপব্যবহার হলে তা রিকুইজিশন থাকে না, তা পরিণত হয় হয়রানিতে। যানবাহনের মালিক ও শ্রমিকরা রাষ্ট্রের শত্রু নন; তারাই রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্রকেই আগে আইন মেনে চলতে হবে। রিকুইজিশনের নামে যদি নাগরিক ভোগান্তি বাড়ে, তবে সেই ক্ষমতার পুনর্বিবেচনা এখন সময়ের দাবি। 

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর