দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘গুপ্ত রাজনীতি’ শব্দটি নতুন নয়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ ও প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে। প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে কিংবা আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সংগঠিত এমন সব তৎপরতা- যেগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।সেগুলোকেই সাধারণভাবে গুপ্ত রাজনীতি বলা যায়। এই গুপ্ত রাজনীতির ব্যাপারে বাংলাদেশের আইন কী বলে? রাষ্ট্র কি যথেষ্টভাবে প্রস্তুত?
গুপ্ত রাজনীতি বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন, সংবিধান ও স্বীকৃত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে ক্ষমতা দখল, প্রভাব বিস্তার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব রাখার গোপন প্রচেষ্টা। এটি হতে পারে- নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের গোপন কার্যক্রম, ছদ্মনামে রাজনৈতিক তৎপরতা, রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতা উসকে দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো, কিংবা ধর্ম, জাতিগত বা আদর্শিক উগ্রতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা।
গণতন্ত্রে মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি মৌলিক অধিকার হলেও, তা অবশ্যই সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। গুপ্ত রাজনীতি সেই সীমারেখা অতিক্রম করে।
সংবিধানের দৃষ্টিতে গুপ্ত রাজনীতি
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের সংগঠন করার অধিকার স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে একই অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে- এই অধিকার জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পরিপন্থী হতে পারবে না। অর্থাৎ, কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা কর্মকাণ্ড যদি গোপনে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়, সহিংসতা উসকে দেয় বা সংবিধানবিরোধী লক্ষ্য ধারণ করে, তাহলে তা সাংবিধানিক সুরক্ষা পায় না।
সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানই দেশের সর্বোচ্চ আইন। এর বিরুদ্ধে কোনো কর্মকাণ্ডই বৈধ নয়—প্রকাশ্য হোক বা গুপ্ত।
দণ্ডবিধি : বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর বিভিন্ন ধারা গুপ্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত :
ধারা ১২১ ও ১২১ক: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা ষড়যন্ত্র। ধারা ১২৩: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে সহায়তা। ধারা ১২৪ক (দেশদ্রোহ): রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা অসন্তোষ উসকে দেওয়া।
গোপনে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার প্রচেষ্টা, সামরিক বা বেসামরিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার পরিকল্পনা- এসবই এই ধারার আওতায় অপরাধ।
গুপ্ত রাজনীতির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধিত) অনুযায়ী- নিষিদ্ধ সংগঠনের গোপন কার্যক্রম, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, প্রচারণা সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো রাজনৈতিক আদর্শের নামে সহিংসতা বা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চালালে তা রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে না।
ডিজিটাল মাধ্যমে গুপ্ত রাজনীতি
বর্তমান সময়ে গুপ্ত রাজনীতির বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ছদ্ম আইডি, গোপন গ্রুপ, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা ও উসকানি ছড়ানো হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (এবং সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনসমূহ) অনুযায়ী- রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার, গুজব ছড়ানো, সহিংসতা উসকে দেওয়া, সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার আইনগতভাবে অপরাধ। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, গোপন ও ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার।
রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম চালাতে হলে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধনবিহীন বা নিষিদ্ধ সংগঠনের মাধ্যমে গুপ্ত রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো আইনত অবৈধ। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (জচঙ) অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বাইরে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা বা সহিংস রাজনীতি গ্রহণযোগ্য নয়।
আইন থাকা সত্ত্বেও গুপ্ত রাজনীতি দমনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গোপন নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন, প্রযুক্তির অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা। তবে এসব চ্যালেঞ্জ আইন প্রয়োগে শৈথিল্যের অজুহাত হতে পারে না।
গুপ্ত রাজনীতি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। করণীয় হলো- আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নজরদারিতে আইনি ও মানবাধিকারসম্মত ভারসাম্য।
রাজনীতি হবে প্রকাশ্য, জবাবদিহিমূলক ও সংবিধানসম্মত। গুপ্ত রাজনীতির কোনো স্থান নেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। আইন স্পষ্ট ভাষায়ই বলছে- রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র অপরাধ, আর অপরাধের পরিণতি শাস্তি। এখন প্রয়োজন সেই আইনের কার্যকর প্রয়োগ।
বিকেপি/এমএইচএস

