Logo

আইন ও বিচার

বেতার ও টেলিযোগাযোগে মিথ্যা বার্তা : গুজবের বিস্তার, আইনি দণ্ড

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৪

বেতার ও টেলিযোগাযোগে মিথ্যা বার্তা : গুজবের বিস্তার, আইনি দণ্ড

ডিজিটাল যুগে যোগাযোগব্যবস্থার দ্রুত বিস্তার যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নতুন ধরনের অপরাধ। মোবাইল ফোন, এসএমএস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক বার্তা প্রেরণ এখন একটি মারাত্মক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে— গুজব ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, আর্থিক প্রতারণা ও ব্যক্তিগত সম্মানহানির মতো ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে— বেতার ও টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে মিথ্যা বার্তা প্রেরণ করলে বাংলাদেশের আইনে কী ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে? এবং সেই আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?

মিথ্যা বার্তা বলতে কী বোঝায়?
আইনগতভাবে মিথ্যা বার্তা বলতে বোঝায় এমন কোনো তথ্য বা বার্তা—যা সত্য নয় অথবা আংশিক সত্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; যা জেনে-বুঝে বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করা হয়েছে; এবং যা জনমনে ভীতি, বিভ্রান্তি, বিদ্বেষ বা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

এই ধরনের বার্তা যদি বেতার, টেলিযোগাযোগ বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রেরণ করা হয়, তবে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

প্রযোজ্য আইনসমূহ : কোন আইনে কী বলা আছে?
বাংলাদেশে বেতার ও টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে মিথ্যা বার্তা প্রেরণের বিরুদ্ধে একাধিক আইন কার্যকর রয়েছে।

টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ধারা ৬৯ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান।

এই ধারায় বলা হয়েছে— কোনো ব্যক্তি যদি টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা, অশালীন, হুমকিমূলক বা বিরক্তিকর বার্তা প্রেরণ করেন, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

শাস্তি : সর্বোচ্চ ৬ মাস থেকে ১ বছর কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।

এই ধারা মোবাইল ফোনে ভুয়া এসএমএস, কলের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা ভীতি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০
মিথ্যা বার্তার ফলে যদি জনশান্তি বিঘ্নিত হয়, তাহলে দণ্ডবিধির একাধিক ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।

ধারা ৫০৫— গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য
এই ধারা অনুযায়ী কেউ যদি মিথ্যা তথ্য প্রচার করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেন, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

শাস্তি : সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।

সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩
(পূর্বের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর স্থলাভিষিক্ত)

বর্তমানে অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩।

ধারা ২৫— মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার 
এই ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ডিজিটাল মাধ্যমে জেনে-বুঝে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রেরণ করেন, যা জনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে পারে, তাহলে তা অপরাধ।

শাস্তি : কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

ধারা ৩১—
আইনশৃঙ্খলা অবনতির উদ্দেশ্যে, রাষ্ট্র বা জনগণের মধ্যে শত্রুতা, বিদ্বেষ বা আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা বার্তা প্রচার করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

বেতার টেলিগ্রাফ আইন, ১৮৮৫ এবং বেতার টেলিগ্রাফি আইন, ১৯৩৩
যদিও আইনগুলো পুরোনো, তবুও বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়া বার্তা প্রচার, রাষ্ট্রবিরোধী বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সম্প্রচার করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।

কোথায় বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে মিথ্যা বার্তা?
বর্তমানে মিথ্যা বার্তা ছড়ানোর প্রধান মাধ্যমগুলো হলো—

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ), ভুয়া এসএমএস ও কল, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বা ভুয়া লিংক। বিশেষ করে নির্বাচনকাল, ধর্মীয় ইস্যু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আর্থিক খাতে এই ধরনের গুজব মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

আইন প্রয়োগে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন—

  • প্রযুক্তিগত ট্র্যাকিং সমস্যা : সব সময় বার্তার উৎস শনাক্ত করা সহজ হয় না।
  • জনসচেতনতার অভাব : অনেকেই জানেন না যে ‘ফরওয়ার্ড’ করাও অপরাধ হতে পারে।
  • অপব্যবহারের অভিযোগ : কিছু ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ নিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার অভিযোগ ওঠে।

ঢাকা জজ আদালতের আইনজীবী কে এম খাইরুল কবীর বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘মিথ্যা বার্তা দমন করতে আইন প্রয়োজন, তবে সেই আইন যেন উদ্দেশ্যমূলক, স্বচ্ছ ও মানবাধিকারসম্মতভাবে প্রয়োগ হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। গুজব যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং আইনের যথাযথ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বেতার ও টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে মিথ্যা বার্তা প্রেরণ শুধু একটি প্রযুক্তিগত অপরাধ নয়— এটি সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন এই অপরাধ দমনে যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও, তার সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগই মূল চ্যালেঞ্জ। গুজবের বিরুদ্ধে আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সচেতন নাগরিক ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল সংস্কৃতি।

বিকেপি/এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত গণমাধ্যম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর