Logo

আইন ও বিচার

নির্বাচনের মুখে বাংলাদেশ : সংঘাত ঠেকাতে গোয়েন্দা সতর্কতা ও অস্ত্র উদ্ধার জরুরি

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৪

নির্বাচনের মুখে বাংলাদেশ : সংঘাত ঠেকাতে গোয়েন্দা সতর্কতা ও অস্ত্র উদ্ধার জরুরি

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই বাংলাদেশ এক ধরনের অদৃশ্য উত্তেজনার মধ্যে প্রবেশ করে। এই উত্তেজনা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে, পাড়া-মহল্লায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনকি ভোটকেন্দ্রের আশপাশেও। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই চেনা বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে, সহিংসতার ভাষা কঠোর হচ্ছে, আর নীরবে সক্রিয় হয়ে উঠছে অবৈধ অস্ত্রের ছায়া। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন একটাই- 

রাষ্ট্র কি আগাম প্রস্তুত? নাকি অতীতের মতো ঘটনার পর প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে? নির্বাচন মানেই কি অস্থিরতা?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন হওয়ার কথা উৎসবের মতো। অথচ আমাদের বাস্তবতায় নির্বাচন প্রায়ই আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়ায়। 

অতীত অভিজ্ঞতা বলে- নির্বাচনের আগে-পরে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক বিভক্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ক্ষমতার প্রশ্নে ‘সব অথবা কিছুই নয়’ মানসিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এবারও ব্যতিক্রমের লক্ষণ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। বরং মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বাড়ছে, উত্তেজনাপূর্ণ কর্মসূচি বাড়ছে, আর সংঘাতের প্রস্তুতিও যে নীরবে চলছে, তার ইঙ্গিত মিলছে বিভিন্ন গোয়েন্দা বিশ্লেষণে।

নির্বাচনী সহিংসতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উপাদান হলো অবৈধ অস্ত্র। রাজনীতি যখন সহনশীলতা হারায়, তখন অস্ত্র হয়ে ওঠে ‘দ্রুত সমাধানের’ হাতিয়ার। অথচ এই অস্ত্রের আঘাত এসে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর-  ভোটার, পথচারী, সাংবাদিক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্রের অস্তিত্ব নতুন নয়। কিন্তু নির্বাচনের সময় এসব অস্ত্র হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। গোপন মজুত, সীমান্তপথে চোরাচালান, স্থানীয় অপরাধীচক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থের যোগ সব মিলিয়ে একটি বিপজ্জনক সমীকরণ তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়; এটি নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করার পূর্বশর্ত।

কেন গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি :

সংঘাত কখনো হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না। এর আগে থাকে পরিকল্পনা, উসকানি ও প্রস্তুতি। এসবের বেশিরভাগই ঘটে চোখের আড়ালে। ফলে কেবল পুলিশি টহল বা দৃশ্যমান নিরাপত্তা দিয়ে সহিংসতা ঠেকানো যায় না। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো মানে সম্ভাব্য সংঘাতের আগাম বার্তা পাওয়া, উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা, অস্ত্র মজুতের স্থান চিহ্নিত করা।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও কেন্দ্র আগেই চিহ্নিত করা :

আইনের শাসনের একটি মৌলিক নীতি হলো প্রতিরোধ শাস্তির চেয়ে উত্তম। গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সহিংসতা কমাতে পারে বহুগুণ। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর প্রশ্নে একটি আশঙ্কা সবসময়ই উঠে আসে- নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে না তো? এই প্রশ্ন অমূলক নয়। তবে মনে রাখতে হবে নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার হলো জীবনের নিরাপত্তা। সহিংসতা ঠেকাতে আইনসম্মত, নিরপেক্ষ ও লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারি নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন নয়; বরং তা সুরক্ষার অংশ।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন নজরদারি রাজনৈতিক পক্ষপাত বা হয়রানির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তাই নজরদারির পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই শক্তি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংঘাতের আশঙ্কা যখন স্পষ্ট, তখন কমিশনের উচিত-  গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া, প্রয়োজনে কঠোর ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা না করা, একটি কেন্দ্র বা এলাকায় সহিংসতার আশঙ্কা থাকলে ভোট স্থগিত রাখা গণতন্ত্রের পরাজয় নয়; বরং তা গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। নির্বাচনী সহিংসতার দায় শুধু প্রশাসনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকেও আত্মসমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে। সহিংস বক্তব্য, কর্মীদের লাগামহীন আচরণ, অস্ত্রধারীদের প্রশ্রয়- এসবের দায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এড়াতে পারে না। রাজনীতি যদি জনকল্যাণের মাধ্যম হয়, তবে সেখানে অস্ত্র ও ভয়ের কোনো স্থান থাকতে পারে না। দেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন হয়তো ঠিক করে দেবে আমরা সংঘাতের পুরনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাব, নাকি ধীরে ধীরে একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দিকে এগোব। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তীব্র করা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখানো- এই তিনটি পদক্ষেপ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন।

নির্বাচন মানে শুধু ভোট গণনা নয়; নির্বাচন মানে মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। যদি সেই নির্বাচন ভয়ের ছায়ায় হয়, তবে তার ফলাফল যাই হোক রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যালটের শক্তি বন্দুকের শব্দে হারিয়ে গেলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আজই সময় সংঘাতের আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার, অস্ত্রের আগেই আইনকে কার্যকর করার, আর ভয়ের আগেই আস্থা ফিরিয়ে আনার। রাষ্ট্র যদি এখনই দৃঢ় হয়, তবে এই নির্বাচন ইতিহাসে সংঘাতের নয়, দায়িত্বশীলতার উদাহরণ হয়েও স্মরণীয় হতে পারে।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর