থানার ওসির ক্ষমতার কেন্দ্রে দায়িত্ব ও সীমারেখা
এহসানুল কবীর হিমেল
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৯
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংক্ষেপে যাকে আমরা ‘ওসি’ নামে চিনি তিনি হলেন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার একেবারে তৃণমূল স্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা। সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রথম ও প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে ওসির ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের পথে প্রথম ধাপটি প্রায়শই নির্ভর করে থানার ওসি কতটা দক্ষ, মানবিক ও আইনানুগ আচরণ করেন তার ওপর।
কিন্তু বাস্তবতা হলো এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের পাশাপাশি ওসির ক্ষমতারও সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইন তাকে যেমন ক্ষমতা দিয়েছে, তেমনি বেঁধে দিয়েছে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামোতে। এই দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতার ভারসাম্য রক্ষা না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিবর্তে তা নাগরিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব ও ক্ষমতার মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে প্রধানত ফৌজদারি কার্যবিধি (ঈৎচঈ, ১৮৯৮), দণ্ডবিধি, ১৮৬০, পুলিশ আইন, ১৮৬১, এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিধিমালার ওপর। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪ নম্বর ধারায় ‘থানা’ ও ‘পুলিশ অফিসার’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতে থানার ওসি মূলত থানার সার্বিক প্রশাসনিক ও তদন্ত কার্যক্রমের প্রধান হিসেবে বিবেচিত। তিনি একই সঙ্গে একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা, অভিযোগ গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষ, গ্রেপ্তার কার্যক্রমের তদারককারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
থানার ওসির প্রধান দায়িত্বসমূহ : থানার ওসির অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা গ্রহণ করা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ তা এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য। এখানে ওসির কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের সুযোগ নেই। মামলা দায়েরের পর তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব থানার ওপর ন্যস্ত হয় এবং সেই তদন্তের সার্বিক তদারকির দায়িত্ব ওসির। তদন্ত যেন নিরপেক্ষ, আইনসম্মত ও সময়োপযোগী হয়- তা নিশ্চিত করা ওসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ওসি আইন অনুযায়ী- সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। তবে এই ক্ষমতা সম্পূর্ণ আইননির্ভর। গ্রেপ্তারের কারণ, সময় ও পদ্ধতি আইন দ্বারা নির্ধারিত। আটক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার রক্ষা করাও ওসির দায়িত্ব। থানার এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সংঘর্ষ বা অপরাধের আশঙ্কা থাকলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, সভা-সমাবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- এসবই ওসির নিয়মিত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। মামলার অগ্রগতি, আসামি হাজিরা, রিমান্ড আবেদন, চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল সব ক্ষেত্রেই ওসিকে আদালতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখতে হয়।
থানার ওসির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা :
ক্ষমতা যেমন আছে, তেমনি আছে কঠোর সীমারেখা। এই সীমা অতিক্রম করলেই ওসি আইনভঙ্গকারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। ইচ্ছামতো মামলা না নেওয়ার সুযোগ নেই। আমলযোগ্য অপরাধে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো আইনত দণ্ডনীয়। উচ্চ আদালত বহুবার স্পষ্টভাবে বলেছেন, এজাহার গ্রহণ না করা ওসির গুরুতর আইনগত ব্যত্যয়। বিচার বিভাগীয় নির্দেশনা অনুযায়ী (বিশেষ করে ইখঅঝঞ বনাম বাংলাদেশ মামলার নির্দেশনা), কোনো ব্যক্তিকে কারণ ছাড়া গ্রেপ্তার, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ক্ষেত্রে ওসির ব্যক্তিগত দায় সৃষ্টি হয়।
বিচারিক ক্ষমতা নেই : ওসি কোনো বিচারক নন। তিনি কাউকে অপরাধী ঘোষণা করতে পারেন না, শাস্তি দিতে পারেন না। তার কাজ তদন্ত করা, রায় দেওয়া নয়।
রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের কাছে নতি স্বীকারের সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী- ওসি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে বাধ্য। কোনো রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সুপারিশ বা ক্ষমতাশালী মহলের চাপে বেআইনি কাজ করলে তার দায়ভার ওসিকেই বহন করতে হয়।
হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা বা হয়রানির ঘটনায় ‘আমি আদেশ পালন করেছি’- এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তিগত দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
বাস্তব মাঠপর্যায়ে থানার ওসির দায়িত্ব পালন সহজ নয়। জনবল সংকট, অতিরিক্ত মামলা, রাজনৈতিক চাপ, সীমিত লজিস্টিক সহায়তা- এসবের মধ্যেই ওসিকে কাজ করতে হয়। তবে এসব সীমাবদ্ধতা কোনোভাবেই আইন লঙ্ঘনের বৈধতা দেয় না।
বরং একজন দক্ষ ওসি তার প্রজ্ঞা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে সীমিত সম্পদের মধ্যেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেন এর বহু উদাহরণ আমাদের সমাজে রয়েছে।
জবাবদিহি ও সংস্কারের প্রয়োজন
থানার ওসিকে কার্যকর ও জনবান্ধব করতে হলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অভ্যন্তরীণ পুলিশ তদারকির পাশাপাশি স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মামলা নিবন্ধন, মানবাধিকার প্রশিক্ষণ এবং আইনি সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও জানতে হবে-ওসির ক্ষমতা কোথায় শেষ, আর নাগরিকের অধিকার কোথায় শুরু।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার এক শক্তিশালী স্তম্ভ। কিন্তু এই শক্তি তখনই জনকল্যাণে রূপ নেয়, যখন তা আইনের সীমার মধ্যে থেকে প্রয়োগ করা হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার যেমন সমাজে ভয় ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে, তেমনি দায়িত্বশীল ও মানবিক ওসি নাগরিকের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে থানার ওসির ভূমিকা তাই দ্বিমুখী- একদিকে দৃঢ়তা, অন্যদিকে সংযম। এই ভারসাম্য রক্ষাই হতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ সমাজ গঠনের প্রথম শর্ত।
বিকেপি/এমবি

