ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে যোগাযোগ এখন মুহূর্তের ব্যাপার। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সব মিলিয়ে ব্যক্তিজীবন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি উন্মুক্ত। এই বাস্তবতায় একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে- ফোনে আড়িপাতা ও কল রেকর্ডিং কি বৈধ? কে করতে পারে, কে পারে না? ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কোথায় গিয়ে শেষ, আর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কোথা থেকে শুরু?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে কল রেকর্ড ফাঁস, গোপন আলাপ ভাইরাল, কিংবা “ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে”- এমন অভিযোগ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু আইন কী বলে? বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানা জরুরি।
সংবিধানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বীকৃতি
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে-
“আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাসগৃহের নিরাপত্তা এবং চিঠিপত্র ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে।”
এখানে “যোগাযোগ” শব্দের মধ্যে স্পষ্টভাবেই টেলিফোন, মোবাইল কল, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, কারও অনুমতি ছাড়া তার ফোনালাপ শোনা বা রেকর্ড করা সাধারণভাবে সংবিধানসম্মত নয়।
তবে একই সঙ্গে সংবিধান ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ’-এর কথাও বলেছে। এখানেই রাষ্ট্রের বিশেষ ক্ষমতার প্রশ্নটি আসে।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী, ধারা ৩৭৮ ও ৪০৩ (চুরি ও অসৎ উদ্দেশ্যে দখল) ধারা ৫০৯ (ব্যক্তিগত সম্মানহানিকর আচরণ) এই ধারাগুলোর আলোকে কারও ব্যক্তিগত কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করে তা অপব্যবহার করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, বিশেষ করে যদি তা মানহানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে করা হয়।
টেলিযোগাযোগ আইন কী বলছে
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ ফোনে আড়িপাতা বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন।
এই আইনের ধারা ৯৭ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, বা অপরাধ দমন ও তদন্তের স্বার্থে সরকার নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষকে টেলিযোগাযোগে আড়িপাতার অনুমতি দিতে পারে। অর্থাৎ, সাধারণ ব্যক্তি বা বেসরকারি সংস্থা ইচ্ছামতো ফোন ট্যাপ করতে পারে না কেবলমাত্র সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, ফোনে আড়িপাতা চালাতে পারে এই অনুমোদন সাধারণত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক আদেশ ছাড়া দেওয়া হয় না।
অনেকেই প্রশ্ন করেন যে, নিজের কল নিজে রেকর্ড করা কি বৈধ?
আইনগতভাবে যদি আপনি নিজে কথোপকথনের অংশ হন, এবং নিজের স্বার্থে বা প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য রেকর্ড করেন, তাহলে তা সাধারণত অপরাধ নয়। তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন অপরপক্ষের অনুমতি ছাড়া সেই রেকর্ড প্রকাশ বা প্রচার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মানহানি বা ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহার করা হয়।
এক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং দণ্ডবিধির মানহানি সংক্রান্ত ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহ, ব্যক্তিগত গোপন তথ্য প্রকাশ, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ভয়ভীতি বা মানহানি এসব অপরাধ হিসেবে গণ্য। বিশেষ করে ধারা ২৬ ও ২৯ ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং মানহানির বিষয়ে কঠোর বিধান রেখেছে। কোনো ব্যক্তির কল রেকর্ড অনুমতি ছাড়া অনলাইনে ছড়ালে এই আইনে মামলা হতে পারে।
দেশের উচ্চ আদালত বিভিন্ন রায়ে বলেছেন- ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মৌলিক অধিকার। ফোনে আড়িপাতা একটি চরম হস্তক্ষেপমূলক ব্যবস্থা। যথাযথ আইনি অনুমোদন ও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া এটি গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত বারবার জোর দিয়েছে- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যেন নাগরিক অধিকার খর্ব না হয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা
বাস্তবে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কল রেকর্ড ফাঁস, পারিবারিক বা দাম্পত্য কল রেকর্ড দিয়ে ব্ল্যাকমেইল, ব্যবসায়িক বিরোধে গোপন আলাপ ফাঁস, এসবই আইনবহির্ভূত ও নৈতিকভাবে নিন্দনীয়। প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজে ভয় ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি সূ² ভারসাম্যের প্রশ্ন। রাষ্ট্র অপরাধ দমন ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে আড়িপাতা চালাতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে আইনের সীমার মধ্যে। নির্দিষ্ট সময় ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে, নির্বিচারে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়। নচেৎ, তা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট মোহাম্মদ আলী গতকাল বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ফোনে আড়িপাতা বিষয়ে স্পষ্ট ও জনসম্মুখে জবাবদিহিমূলক নীতিমালা প্রয়োজন। আড়িপাতার অনুমতিতে আদালতের নজরদারি থাকা জরুরি। সাধারণ মানুষকে জানতে হবে কল রেকর্ড করা ও শেয়ার করার আইনি ঝুঁকি কী। ব্যক্তিগত আক্রোশ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় প্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
ফোনে আড়িপাতা ও কল রেকর্ডিং- এই দুইয়ের মাঝখানে রয়েছে নাগরিকের গোপনীয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সূক্ষ্ম সীমারেখা। আইন সেই সীমারেখা টেনে দিয়েছে। এখন দায়িত্ব রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সবার। প্রযুক্তি যেন নিরাপত্তার হাতিয়ার হয়, ভয়ের অস্ত্র নয়, এই প্রত্যাশাই আজকের সম্পাদকীয়র মূল কথা।
বিকিপি/এমবি

