জাতীয় নির্বাচন কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোনো দলীয় উৎসবও নয়- এটি একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও গণতান্ত্রিক ভিত্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি পবিত্র প্রক্রিয়া। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের এই ব্যবস্থাকে কলুষিত করার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র হলো জাল ভোট। প্রকাশ্য সহিংসতা যেমন রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে, তেমনি নীরবে সংঘটিত জাল ভোট ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলে। দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জাল ভোট নতুন কোনো শব্দ নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য একটাই- জনমতকে বিকৃত করা, জনগণের রায়কে অপমান করা।
জাল ভোট কী? আইনের চোখে আইনগতভাবে জাল ভোট বলতে বোঝায় অন্য ব্যক্তির নামে বা পরিচয়ে ভোট প্রদান, মৃত বা অনুপস্থিত ব্যক্তির নামে ভোট দেওয়া, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও ভোট প্রদান, একাধিকবার ভোট দেওয়া, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তার সহায়তায় বেআইনিভাবে ব্যালট বা ইভিএমে ভোট প্রদান। এসব কাজ সরাসরি নির্বাচনী অপরাধ, যা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও গণ্য।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- প্রজাতন্ত্র হবে গণতান্ত্রিক এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ গঠিত হবে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। অতএব, জাল ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করা মানেই সংবিধানের মৌলিক চেতনাকে অস্বীকার করা। এটি রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে না পড়লেও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করার অপরাধ- এ কথা বললে অত্যুক্তি হয় না। প্রযোজ্য আইন কঠোর হলেও প্রয়োগে শৈথিল্য। জাতীয় নির্বাচনে জাল ভোটের অপরাধ ও শাস্তি নির্ধারণে প্রধান আইন হলো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (জচঙ) বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮। আইন আছে, শাস্তিও কম নয়, সমস্যা মূলত প্রয়োগে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী শাস্তি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৭৩ ও ৭৪ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- কোনো ব্যক্তি যদি জেনে-বুঝে জাল ভোট দেয় বা দেওয়ার চেষ্টা করে, অন্য কাউকে জাল ভোট দিতে সহায়তা করে, ভোট গ্রহণে প্রতারণা বা অসদুপায় অবলম্বন করে, তাহলে তা হবে দণ্ডনীয় অপরাধ।
শাস্তির বিধান : সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড একত্রে। এছাড়া আদালত চাইলে দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেন- যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শাস্তি। জাল ভোট শুধু নির্বাচনী আইন ভঙ্গ নয়, এটি সরাসরি দণ্ডবিধির অপরাধও বটে।
প্রাসঙ্গিক ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ধারা ১৭১বি ও ১৭১সি: নির্বাচন সংক্রান্ত দুর্নীতি ও অবৈধ প্রভাব। ধারা ৪১৯: প্রতারণার মাধ্যমে সুবিধা গ্রহণ। ধারা ৪৬৫-৪৬৮: জাল দলিল প্রস্তুত ও ব্যবহার। ধারা ৪৭১: জাল দলিল জেনেশুনে ব্যবহার। এসব ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। বর্তমান সময়ে জাল ভোটের বড় একটি অংশ সংঘটিত হয় ভুয়া বা অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০ অনুযায়ী- ভুয়া তথ্য দিয়ে এনআইডি সংগ্রহ বা ব্যবহার করা, অন্যের এনআইডি ব্যবহার করা, এগুলো ফৌজদারি অপরাধ।
শাস্তি : সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড, অথবা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড। বাস্তবতা হলো- জাল ভোট অনেক সময় একা একজন ভোটারের পক্ষে সম্ভব হয় না। কোথাও না কোথাও নির্বাচন কর্মকর্তার গাফিলতি, উদাসীনতা কিংবা প্রত্যক্ষ সহযোগিতা জড়িত থাকে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী- কোনো প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার বা পোলিং অফিসার যদি জাল ভোটে সহায়তা করেন, অথবা জেনেশুনে বেআইনি ভোট গ্রহণ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং চাকরি থেকে বরখাস্তের বিধান রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য- এই ধারার প্রয়োগ সবচেয়ে কম দেখা যায়।
মামলা, বিচার ও নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা :
জাল ভোটের অভিযোগে নির্বাচন চলাকালীন বা ফল ঘোষণার পর মামলা দায়ের করা যায়। নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট বা যে কোনো নাগরিক অভিযোগ করতে পারেন। প্রমাণ সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশন পুরো কেন্দ্র বা আসনের ভোট বাতিল করে পুনঃভোটের নির্দেশ দিতে পারে। আইনে দ্রুত নিষ্পত্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে এসব মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। জাল ভোটের ক্ষতি কেবল নির্বাচনী ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়- জনগণের ভোটাধিকার অর্থহীন হয়ে পড়ে, সৎ প্রার্থীরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অনাস্থা বাড়ে, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্র দীর্ঘদিন জাল ভোট সহ্য করতে পারে না- শেষ পর্যন্ত তার গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
জাল ভোট রোধে কেবল আইন থাকলেই চলবে না, দরকার আইনের নির্বিচার প্রয়োগ, নির্বাচন কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহি, অপরাধে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ভোটারদের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা ও কার্যকর ভূমিকা।
জাল ভোট কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি গুরুতর অপরাধ। যে সমাজ জাল ভোটকে মেনে নেয়, সে সমাজ একদিন ভোটের অধিকারই হারায়। আইন আছে, শাস্তি আছে- এখন সময় এসেছে ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে জাল ভোটের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। আজ যদি জাল ভোট উপেক্ষা করা হয়, কাল তার মাশুল দিতে হবে পুরো জাতিকে।
বিকেপি/এমবি

