বাণিজ্যিক আদালত : বিচারব্যবস্থায় সময়োপযোগী ও সাহসী সংস্কার
বায়েজিদ তাশরীক
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৩
একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা যতটা নির্ভর করে বিনিয়োগ, শিল্প ও বাণিজ্যের ওপর, ঠিক ততটাই নির্ভর করে দ্রুত, কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারব্যবস্থার ওপর। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চিত বিচারপ্রক্রিয়া বিনিয়োগের অন্যতম বড় অন্তরায়। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার ফলে যেমন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও পড়ে ঝুঁকির মুখে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই সরকার প্রথমবারের মতো সারাদেশে বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একটি সময়োপযোগী ও সাহসী সংস্কার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে বাণিজ্যিক আদালত গঠিত হলো। বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এসব আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ঢাকা মহানগরে তিনটি বাণিজ্যিক আদালত স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুর, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল—এই ছয়টি মহানগরের জন্য একটি করে আদালত গঠন করা হয়েছে। মহানগরের বাইরেও জেলা পর্যায়ে আদালত যুক্ত করে সারাদেশে মোট ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংখ্যার বিচারে যেমন এটি গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর কাঠামোগত তাৎপর্যও গভীর।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে বাণিজ্যিক মামলা সাধারণ দেওয়ানি আদালতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে বাণিজ্যিক বিরোধের সঙ্গে জমিজমা, পারিবারিক কিংবা অন্যান্য দেওয়ানি মামলা একই আদালতে চলেছে। এর পরিণতিতে ব্যাংকঋণ আদায়, চুক্তি ভঙ্গ, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সময় লেগেছে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। এই দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসায়িক স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষায়িত আদালতের অভাবে বিচারকদের জন্যও আধুনিক কর্পোরেট কাঠামো, আর্থিক জটিলতা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ক মামলা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছিল।
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের ঊর্ধ্বে সব বাণিজ্যিক বিরোধ বাণিজ্যিক আদালতেই বিচারাধীন হবে। মামলার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা থাকবে এবং অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ রোধে বিচারকদের হাতে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও রায় প্রদানের ক্ষেত্রে দ্রুততা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি আলাদা ও কার্যকর কাঠামো গড়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।
আইনের মূল দর্শন একটাই—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা প্রকৃত ন্যায়বিচার নয়। বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার অর্থনীতির জন্য একটি স্পষ্ট ও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। এতে ব্যবসায়িক চুক্তির নিরাপত্তা বাড়বে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায় সহজ হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে গতি আসবে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা সহজীকরণে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে আসছিল। এই উদ্যোগ সেই সুপারিশেরই বাস্তব প্রতিফলন।
তবে কেবল আদালত প্রতিষ্ঠাই যথেষ্ট নয়। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বিচারক ও জনবল নিয়োগ, বাণিজ্যিক আইন ও কর্পোরেট ফাইন্যান্সে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা এবং কার্যকর নজরদারি—এসব নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি আইনজীবীদের মধ্যেও দ্রুত বিচার মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে বাণিজ্যিক আদালত স্থাপনের সিদ্ধান্ত ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক, যা উদ্যোক্তাবান্ধব বিচারব্যবস্থারই পরিচয় বহন করে।
সব মিলিয়ে, ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা একটি সাহসী, সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এটি যদি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে দ্রুত, দক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তবে বলা যায়—বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সত্যিই এক নতুন যুগে প্রবেশ করল; যেখানে বাণিজ্য আর অনিশ্চয়তার ভারে থমকে থাকবে না, বরং আইনের সুরক্ষায় এগিয়ে যাবে নিশ্চিন্ত পথে।
বিকেপি/এমবি

