ভোটকেন্দ্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ
এহসানুল কবীর হিমেল
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৭
গণতন্ত্রের মূল শক্তি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের প্রাণকেন্দ্র হলো ভোটকেন্দ্র। ভোটার যখন নির্ভয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তখনই গণতন্ত্র অর্থবহ হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই ভোটকেন্দ্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, অস্ত্রের মহড়া, জোরপূর্বক ভোটগ্রহণ, জাল ভোট এবং ভোটারদের ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠে আসে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু একটি নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।
ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন বলতে বোঝায়- ভোটকেন্দ্রে বা তার আশপাশে ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, হুমকি দেওয়া, শারীরিকভাবে বাধা দেওয়া কিংবা এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা যাতে ভোটার ভোট দিতে না আসেন বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাধ্য হন। এই ভীতি প্রদর্শন কখনো প্রকাশ্য, কখনো অপ্রকাশ্য। লাঠিসোঁটা, আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা কিংবা রাজনৈতিক ক্যাডারদের দাপট সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এসব অপরাধকে মোটেও হালকাভাবে দেখেনি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২, দণ্ডবিধি, ১৮৬০, এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ একাধিক আইনে ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। RPO অনুযায়ী, ভোটারকে ভোটদান থেকে বিরত রাখা, জোরপূর্বক ভোট আদায়, ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কিংবা অস্ত্র প্রদর্শন গুরুতর অপরাধ। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার ক্ষমতাও রয়েছে।
ভোটকেন্দ্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হলে কেবল অপরাধীরাই দায়ী নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতাও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রিসাইডিং অফিসারদের দায়িত্ব হলো ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন বা প্রভাবশালীদের চাপে নীরব ভূমিকা পালন করেন। এই নীরবতাই অপরাধীদের সাহস জোগায়।
দণ্ডবিধির আলোকে ভোটকেন্দ্রে দাঙ্গা সংঘটিত হলে তা দাঙ্গা (Riot) হিসেবে গণ্য হয়, যার জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রয়েছে। যদি আগ্নেয়াস্ত্র বা মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, তবে শাস্তির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ভোটকেন্দ্রে ভোটারকে মারধর, অবরুদ্ধ করা কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া স্পষ্টতই ফৌজদারি অপরাধ।
আইন থাকা সত্ত্বেও কেন অপরাধ কমছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আইনের প্রয়োগে দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে। নির্বাচনের পর অনেক সহিংসতার ঘটনাই ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ কিংবা ‘পরিস্থিতি বিবেচনায়’ ধামাচাপা পড়ে যায়। মামলা হলেও তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষীর অভাব কিংবা প্রভাব খাটিয়ে আসামিরা পার পেয়ে যায়। ফলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন কেবল একটি ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত ভোটাধিকার হরণের শামিল। সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদে নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সেই অধিকার বাধাগ্রস্ত করা মানে সংবিধান লঙ্ঘন করা। গণতন্ত্রের শিকড়ে আঘাত হানা এমন অপরাধে কোনো রকম শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য নয়।
এক্ষেত্রে প্রয়োজন কঠোর ও নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ। নির্বাচনের দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারকদের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। ভোটকেন্দ্রে দাঙ্গা বা ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীরা বার্তা পাবে- ভোট নিয়ে ছিনিমিনি খেললে ছাড় নেই।
ভোটকেন্দ্রে শান্তি বজায় রাখা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে আইন একা সব সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না। ভোটারদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করাই একটি সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয়। অন্যথায় নির্বাচন নামক উৎসব বারবার পরিণত হবে আতঙ্ক ও সহিংসতার প্রতীক হিসেবে- যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বিকেপি/এমএম

