Logo

আইন ও বিচার

বিচারের মুখোমুখি করতে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া: আইন কী বলে

Icon

মাসুম আহম্মেদ

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৪

বিচারের মুখোমুখি করতে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া: আইন কী বলে

দেশের রাজনীতিতে আবারও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির ঘোষণা- বিচারের মুখোমুখি করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনা হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদ প্রকাশ্যে এ দাবি তুলে ধরেছেন। এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ; তবে প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে আইন কী বলে? বাস্তবতা কতটা সম্ভব? রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোই বা কী?

রাজনীতিতে “বিচার” শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও আইনের চোখে বিচার মানে নির্দিষ্ট অপরাধ, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং যথাযথ আদালত। কোনো ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করতে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই নির্ধারিত আইনি পথ অনুসরণ করতে হয়।

বিএনপির দাবি মূলত রাজনৈতিক; কিন্তু সেই দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় আইনি কাঠামোর ভেতরেই চলতে হবে।

কাউকে “ফেরত আনা” বলতে আইন কী বোঝে

আইনের ভাষায় কাউকে বিদেশ থেকে দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়াকে বলা হয় প্রত্যর্পণ (Extradition)। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ইচ্ছায় নয়, রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি ও কূটনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে হয়।

বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত মূল আইন হলো:

প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৭৪, আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ চুক্তি (Bilateral Extradition Treaty), আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, এই আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে কাউকে “ফেরত আনা” সম্ভব নয়।

প্রত্যর্পণ আইন, ১৯৭৪  অনুযায়ী- অপরাধটি অবশ্যই ফৌজদারি হতে হবে।

রাজনৈতিক বক্তব্য, নীতিগত সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সাধারণত প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না।

অপরাধ দ্বৈত অপরাধ হতে হবে (Dual Criminality) অর্থাৎ যে দেশে অভিযুক্ত অবস্থান করছেন, সেই দেশেও অপরাধটি শাস্তিযোগ্য হতে হবে। চার্জশিট ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকতে হবে, কেবল অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্য প্রত্যর্পণের ভিত্তি হতে পারে না রাজনৈতিক অপরাধে প্রত্যর্পণ হয় না।

আন্তর্জাতিক আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো- Political Offence Exception। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। রাজনৈতিক অপরাধ: ক্ষমতার সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ইত্যাদি। মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ যদি অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত হয় এবং তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়, তখন প্রত্যর্পণের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্ন ওঠে।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী- কাউকে এমন দেশে প্রত্যর্পণ করা যাবে না, যেখানে ন্যায্য বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধমূলক বিচার হলে প্রত্যর্পণ বাধাগ্রস্ত হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

অতএব, শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর “বিচার করা হবে”- এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।

এর আগে অনেকে মনে করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে। আইন বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।

রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও বিদেশি রাষ্ট্রকে বাধ্য করা যায় না। আদালতের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে প্রত্যর্পণ ব্যর্থ হয়। আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বড় ভূমিকা রাখে। অতএব ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই আইনি সাফল্য নয়।

বিশ্ব রাজনীতিতে বহু রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কিন্তু প্রত্যর্পণ সফল হয়েছে খুব কম ক্ষেত্রেই। কারণ রাজনৈতিক আশ্রয় (Political Asylum), মানবাধিকার ঝুঁকি, বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, এই বাস্তবতা বাংলাদেশকেও মাথায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী- আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সংবিধানবিরোধী। বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে যদি বিচারকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা সংবিধানের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এর আগে গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরেক আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) রাজসাক্ষী চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেওয়া হয়েছে ৫ বছরের লঘুদণ্ড। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি যারা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত হয়েছেন, তাদের কনসিডারেবল অ্যামাউন্ট (উল্লেখযোগ্য পরিমাণ) আন্দোলনকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া আহত আন্দোলনকারীদের আঘাতের মাত্রা ও ক্ষতি বিবেচনায় পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে রায়ে।

জনাকীর্ণ আদালতে বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণা উপলক্ষ্যে জুলাই শহীদপরিবারের সদস্য এবং আহতদের বেশ কয়েকজন ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। রায়ে শেখ হাসিনার ফাঁসির আদেশ শুনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। শহীদ আনাসের মা সন্তানের স্মৃতি মনে করে কেঁদে ফেলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেছেন, এটি যুগান্তকারী রায়। ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন জুলাই যোদ্ধাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। তারা চৌধুরী মামুনের সাজা কম হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক থাকায় রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিলের সুযোগ পাচ্ছেন না। আপিল করতে হলে তাদের ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবীও বলেছেন, আইনে না থাকায় তার আসামির আপিলের সুযোগ নেই।

জুলাই আন্দোলনে ১৪০০ ছাত্র-জনতাকে হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে করা কোনো মামলায় এটিই  ছিলো প্রথম রায়। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। 

জনগণকে জিম্মি করে স্বৈরাচারী কায়দায় সাড়ে ১৫ বছর দেশে শাসনের নামে পরিবারতন্ত্র কায়েম করেছিলেন শেখ হাসিনা। তার আশপাশে গড়ে তোলেন চাটুকার বাহিনী। তাদের সবার স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন জনগণের প্রতিপক্ষ। কিন্তু তার গুম-খুন বাহিনীর ভয়ে কেউ তার অপশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারত না। ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একদলীয় শাসনের চূড়ান্ত নীলনকশা নতুন প্রজন্ম ও ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পেরে তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোটা সংস্কার আন্দোলন ইস্যুতে মাঠে নামে। শেষ পর্যন্ত টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি কোনো মতে ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করেন। তার সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানাও পালিয়ে যান। শেখ হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন বলে রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ করে আসছে। তার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার রায় যত এগিয়ে আসছিল, তিনি ততই বেপরোয়া আচরণ শুরু করেন। তার নির্দেশে দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির কিছু দুষ্কৃতকারী কর্মী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। কিন্তু অন্তর্র্বতী সরকার কঠোর অবস্থানে থাকায় তারা সুবিধা করতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম সাবেক সরকারপ্রধান, যার মাথার ওপর এখন ঝুলছে মৃত্যুদণ্ডের রায়। এর আগে আর কোনো সরকারপ্রধানকে এভাবে গণহত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মুখে পড়তে হয়নি কোনো আদালত থেকেই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকেই শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ সাজার রায় এলো, যে আদালত তার সরকার গঠন করেছিল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে ভিন্নমতের রাজনীতির মুখ বন্ধ করার জন্য।

তবে বিজ্ঞজনেরা মনে করছেন, বিচারের মুখোমুখি করতে কাউকে দেশে ফেরত আনার দাবি রাজনৈতিকভাবে যতই জনপ্রিয় হোক, আইনের কাঠামো অত্যন্ত কঠোর ও নির্দিষ্ট। প্রত্যর্পণ কোনো স্লোগান নয়, এটি দীর্ঘ, জটিল ও আন্তর্জাতিকভাবে সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র যদি সত্যিই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তাকে  নিরপেক্ষ তদন্ত, আন্তর্জাতিক মানের বিচার, রাজনৈতিক প্রতিহিংসামুক্ত অবস্থান, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়াতে হবে।

অন্যথায়, “ফেরত আনা হবে”- এই বক্তব্য থেকে যাবে রাজনৈতিক বক্তব্যের গণ্ডিতেই; আইনের আদালতে তার ওজন হবে শূন্য। আইন আবেগে চলে না, চলে প্রমাণে। রাজনীতি বদলায়, কিন্তু আইন তার নিজস্ব পথে অটল থাকে।

বিকেপি/এমবি

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর