Logo

আইন ও বিচার

বেসরকারি বিমান চলাচল আইন : আকাশপথে শাসন ও নিরাপত্তা

Icon

সোমা কবীর

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০২

বেসরকারি বিমান চলাচল আইন : আকাশপথে শাসন ও নিরাপত্তা

আধুনিক রাষ্ট্রে বিমান চলাচল আর বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বাংলাদেশেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আকাশপথে বেসরকারি বিমান সংস্থার সংখ্যা বেড়েছে। যাত্রী পরিবহন, কার্গো, চার্টার্ড ফ্লাইট সব মিলিয়ে বেসরকারি বিমান চলাচল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তবে এই খাত যত সম্প্রসারিত হচ্ছে, ততই সামনে আসছে আইন, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্ন। এখানেই বেসরকারি বিমান চলাচল আইন একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিমান চলাচল পরিচালিত হয় মূলত বেসামরিক বিমান চলাচল আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আওতায়। এই আইনগুলোর উদ্দেশ্য হলো  আকাশপথে যাত্রী ও পণ্যের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, বিমান সংস্থার লাইসেন্স ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মান ও চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা, দুর্ঘটনা, অব্যবস্থাপনা ও আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান। এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB)।

বিমান চলাচল অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার তুলনায় ভিন্ন। এখানে সামান্য অবহেলাও বড় দুর্ঘটনায় রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি বিমান সংস্থার ক্ষেত্রে লাভের চাপ, খরচ কমানোর প্রবণতা, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা, পাইলট ও ক্রু ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি। এই ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে শক্ত আইন ও কঠোর তদারকি অপরিহার্য। বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।

বেসরকারি বিমান সংস্থা পরিচালনার জন্য একাধিক অনুমোদন প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (AOC) রুট পারমিশন, বিমান রেজিস্ট্রেশন, পাইলট ও ক্রু লাইসেন্স। আইন অনুযায়ী, এসব অনুমোদন ছাড়া কোনো বেসরকারি সংস্থা আকাশপথে কার্যক্রম চালাতে পারে না। বাস্তবে দেখা যায়, লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় অনেক সময় অনিয়ম ও তদবিরের অভিযোগ ওঠে। এটি আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতারই প্রতিফলন

বেসরকারি বিমান চলাচল আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যাত্রী নিরাপত্তা। বিমান দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানিই নয়, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আইনে বলা আছে- বিমানের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক, প্রশিক্ষিত পাইলট ও ক্রু নিয়োগ অপরিহার্য। নিরাপত্তা নির্দেশনা মানা বাধ্যতামূলক তবে যাত্রী অধিকার বিষয়ে আইন এখনও তুলনামূলক দুর্বল। ফ্লাইট বাতিল, দীর্ঘ বিলম্ব বা টিকিটসংক্রান্ত প্রতারণায় যাত্রীদের প্রতিকার পাওয়ার পথ স্পষ্ট নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আইনি সুরক্ষা পান না।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার অংশ। ফলে আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা আমাদের বাধ্যবাধকতা। এই মান নির্ধারণে নেতৃত্ব দিচ্ছে International Civil Aviation Organization (ICAO) ICAO-এর নিরাপত্তা, ন্যাভিগেশন ও প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ না করলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোকে এই মানদণ্ডে আনতে হলে আইন ও তদারকি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বিমান দুর্ঘটনার পর তদন্ত একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইনে তদন্ত কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও প্রশ্ন ওঠে  তদন্ত কতটা স্বাধীন? দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তি কতটা কার্যকর? সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় কি না। যদি আইন লঙ্ঘনের পরও কার্যকর শাস্তি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।

বেসরকারি খাতের বিকাশ ও আইনের ভারসাম্য

একটি কার্যকর বেসরকারি বিমান চলাচল আইন মানে কেবল শাস্তির বিধান নয়। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত  নিরাপত্তা নিশ্চিত করে খাতের বিকাশ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন ক্ষতিকর, তেমনি শিথিলতা আরও ভয়াবহ। আইনের ভারসাম্যই এখানে মূল চাবিকাঠি। বর্তমান বাস্তবতায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি- বেসরকারি বিমান চলাচল আইন যুগোপযোগী করা, CAAB-এর সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো, যাত্রী অধিকার সংরক্ষণে স্পষ্ট বিধান যুক্ত করা, দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যবস্থাকে স্বাধীন ও পেশাদার করা, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা। আকাশপথে নিরাপত্তা কোনো আপসের বিষয় নয়। বেসরকারি বিমান চলাচল আইন তাই কেবল প্রশাসনিক দলিল নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের সম্মান ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আইন শক্তিশালী ও কার্যকর হলে বেসরকারি বিমান খাতও নিরাপদ ও টেকসই হবে। অন্যথায় আকাশপথের অনিয়ম মাটিতে নেমে আসবে ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে। সময় এসেছে বেসরকারি বিমান চলাচল আইনকে কাগজে নয়, বাস্তবে কার্যকর করার।

বিকেপি/এমবি

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর