রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সর্বাধিক আস্থার প্রতীক। জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল এই বিভাগে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের পরিচয় ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ কারণেই প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে- একজন বিচারক অবসর গ্রহণের পরও কেন তাঁর নামের আগে ‘বিচারপতি’ লেখা হয়? অবসর তো মানে দায়িত্বের সমাপ্তি; তাহলে পদবি বহাল থাকে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে সংবিধান, আইন, রাষ্ট্রীয় রীতি ও আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রথার ভেতরে।
‘বিচারপতি’ কোনো সাধারণ চাকরির পদবি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক মর্যাদা। সংবিধান অনুযায়ী যাঁরা উচ্চ আদালতে বিচারক হিসেবে শপথ নেন, তাঁরা কেবল একটি চাকরি গ্রহণ করেন না বরং রাষ্ট্রের পক্ষে ন্যায়বিচার প্রদানের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের মহামান্য বিচারকরা সংবিধানের অধীনে নিযুক্ত হন এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে শপথ গ্রহণ করেন। এই শপথ তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও ঐতিহাসিক পরিচয় তৈরি করে। এই কারণেই ‘বিচারপতি’ শব্দটি শুধুই কর্মকালীন পদ নয়; এটি একটি অর্জিত রাষ্ট্রীয় উপাধি। সংবিধানের দৃষ্টিতে অবসর : দেশের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা নির্দিষ্ট বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর মানে হলো বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সমাপ্তি, আদালতে বেঞ্চে বসে বিচারকার্য পরিচালনার অবসান। কিন্তু সংবিধান বা কোনো আইনেই বলা নেই যে অবসরের সঙ্গে সঙ্গে বিচারকের উপাধি বা মর্যাদা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ অবসর ক্ষমতার অবসান ঘটায়, কিন্তু পরিচয়ের বিলুপ্তি ঘটায় না। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে বিচারপতিদের অবস্থান অত্যন্ত উচ্চ। অবসরপ্রাপ্ত হলেও তাঁরা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মান পান।
জাতীয় ও সাংবিধানিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন। অনেক ক্ষেত্রে কমিশন, ট্রাইব্যুনাল বা অনুসন্ধান কমিটির নেতৃত্ব দেন। এসব ক্ষেত্রেই তাঁদের পরিচয় লেখা হয় ‘অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি’। এখানে ‘অবসরপ্রাপ্ত’ শব্দটি দায়িত্ব শেষ হওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে, আর ‘বিচারপতি’ শব্দটি নির্দেশ করে তাঁদের অর্জিত সাংবিধানিক মর্যাদা। একজন সরকারি কর্মকর্তা অবসর নিলে তাঁর পদবি আর ব্যবহৃত হয় না। একজন জেলা প্রশাসক অবসর নিলে তাঁকে আর ‘ডিসি’ বলা হয় না। কিন্তু বিচারপতির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। কারণ বিচারকরা নির্বাহী কর্মচারী নন, তাঁরা সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। তাঁদের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র ও সমাজে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই বিচারকদের পরিচয়কে পেশাগত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এর দীর্ঘ বিচারিক প্রথায় দেখা যায়, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নাম সবসময় ‘বিচারপতি’ উপাধিসহ উল্লেখ করা হয়। এটি কোনো ব্যক্তিগত সৌজন্য নয়; বরং আদালত-স্বীকৃত রীতি। রায়, স্মারক, রাষ্ট্রীয় নথি কিংবা আইন বিষয়ক আলোচনায় এই উপাধি ব্যবহার করা হয় বিচারিক মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশে একই রীতি অনুসরণ করা হয়। যুক্তরাজ্য, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নামের আগে বা পরে ‘Justice’ বা ‘Judge (Retd.)’ লেখা হয়। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার অংশ।
এই প্রথা বজায় রাখার পেছনে একটি বড় যুক্তি হলো বিচারকদের সিদ্ধান্ত যেন অবসরোত্তর জীবনে প্রশ্নবিদ্ধ বা খাটো না করা হয়।
বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকরা প্রায়ই আইন সংস্কার কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, আন্তর্জাতিক সালিশ বা তদন্ত কমিটি ইত্যাদিতে দায়িত্ব পালন করেন। এসব ক্ষেত্রেও তাঁদের বিচারপতি হিসেবে পরিচয়ই তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি। যদি অবসরের সঙ্গে সঙ্গে এই উপাধি বিলুপ্ত করা হতো, তাহলে রাষ্ট্র নিজেই বিচারিক অভিজ্ঞতাকে খাটো করত। অনেক সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কি এখনও বিচারক? উত্তর স্পষ্ট- ‘না’। তাঁরা আর বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না। কিন্তু তাঁদের নামের আগে ‘বিচারপতি’ লেখা মানে এই নয় যে তাঁরা এখনও বেঞ্চে বসছেন; এর অর্থ হলো তাঁরা একসময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বিচারপতির উপাধি অবসরের পরও বহাল রাখার একটি গভীর তাৎপর্য আছে। এটি বিচার বিভাগকে ব্যক্তির চেয়ে বড় করে তোলে। একজন বিচারক অবসর নিলেও বিচার বিভাগের সম্মান যেন ক্ষুণ্ন না হয়- এটাই রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। এতে বিচারকরা দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপমুক্ত থাকার মনোবল পান, কারণ তাঁরা জানেন রাষ্ট্র তাঁদের মর্যাদা আজীবন স্বীকৃতি দেবে।
অবসর মানে দায়িত্বের অবসান, মর্যাদার নয়। ‘বিচারপতি’ কোনো চাকরির টাইটেল নয়; এটি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রদত্ত এক আজীবন সম্মান। সংবিধান, আইন ও আন্তর্জাতিক প্রথা সব মিলিয়েই এই রীতি প্রতিষ্ঠিত। তাই অবসরপ্রাপ্ত হলেও নামের আগে ‘বিচারপতি’ লেখা কোনো সৌজন্য বা বাড়তি সম্মান নয়; এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তাঁদের অবদানের প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। বিচার বিভাগ শক্তিশালী থাকে তখনই, যখন বিচারকের মর্যাদা অবসরের সঙ্গেও অটুট থাকে।
বিকেপি/এমবি

