Logo

আইন ও বিচার

গান পণ্য, নাকি শিল্পীর আত্মা! গানের স্বত্ব বিক্রি : আইন ও বাস্তবতা

Icon

সোহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:২১

গান পণ্য, নাকি শিল্পীর আত্মা! গানের স্বত্ব বিক্রি : আইন ও বাস্তবতা

গান একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাহক। সুর ও কথার মধ্য দিয়ে একটি সময়, সমাজ ও মানুষের অনুভূতি ধারণ করে গান। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো এই গানই আজ ক্রমশ শিল্পীর হাতছাড়া হয়ে কেবল বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ নিচ্ছে। বিশেষত গানের স্বত্ব বিক্রির প্রবণতা বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গানের স্বত্ব বিক্রি কি শিল্পীর ন্যায্য অধিকার প্রয়োগ, নাকি অজ্ঞতা ও আর্থিক চাপে ভবিষ্যৎ আত্মসমর্পণ?

আইন অনুযায়ী- গান একটি সৃজনশীল কর্ম। এর ওপর স্বত্ব বা কপিরাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় গানের রচনার সঙ্গে সঙ্গেই। বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রযোজ্য আইন হলো কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত)। এই আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- গানের কথা, সুর ও রেকর্ডিং প্রতিটি আলাদা স্বত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অর্থাৎ একজন গীতিকার কথার স্বত্বের মালিক, সুরকার সুরের এবং প্রযোজক বা রেকর্ড কোম্পানি রেকর্ডিংয়ের স্বত্বের মালিক হতে পারেন।

আইন আরও বলছে, কপিরাইট একটি হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তি। চুক্তির মাধ্যমে তা বিক্রি, হস্তান্তর বা লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব। তবে সেই চুক্তি অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং তাতে মেয়াদ, ব্যবহারক্ষেত্র ও পারিশ্রমিকের বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকতে হবে।

বাংলাদেশে কপিরাইট নিবন্ধন ও সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস। যদিও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়, তবে ভবিষ্যৎ বিরোধে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

গানের স্বত্ব বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো ‘চিরস্থায়ী হস্তান্তর’ বা Perpetual Assignment। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক নতুন কিংবা আর্থিকভাবে দুর্বল শিল্পী এককালীন সামান্য অর্থের বিনিময়ে আজীবনের জন্য গানের সব অধিকার প্রযোজক বা লেবেলের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

একবার এই স্বত্ব বিক্রি হয়ে গেলে শিল্পী ভবিষ্যতে গানটি কোথায় ও কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সে বিষয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক প্রচার কিংবা বিকৃত ব্যবহারে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে না। গান জনপ্রিয় হলেও শিল্পী আর কোনো রয়্যালটি পান না। আইন এ ধরনের চুক্তিকে বৈধতা দিলেও প্রশ্ন থেকেই যায়- এটি কি ন্যায্য?

এককালীন টাকা বনাম রয়্যালটি, ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল। বিশ্ব সংগীত শিল্পে এখন রয়্যালটিভিত্তিক ব্যবস্থাই মূলধারা। অর্থাৎ গান যতবার বাজবে, ব্যবহৃত হবে বা স্ট্রিম হবে- শিল্পী ততবার আয় পাবেন। অথচ বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ শিল্পী এককালীন পারিশ্রমিকেই সন্তুষ্ট থাকেন। এর কারণ হিসেবে উঠে আসে আইনি অজ্ঞতা, দীর্ঘমেয়াদি আয়ের ধারণার অভাব, প্রযোজক বা মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপ, চুক্তিপত্র না পড়ে স্বাক্ষর করার প্রবণতা, ফলে একটি গান বছরের পর বছর আয় করলেও শিল্পী বঞ্চিত থাকেন, লাভবান হন অন্যরা।

ডিজিটাল যুগে স্বত্ব সংকট আরো গভীর

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংগীতকে বিশ্বজুড়ে পৌঁছে দিয়েছে। ইউটিউব, স্পটিফাই, ফেসবুক কিংবা শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে গান ব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই আয়ের ভাগ পাচ্ছেন কে?

স্বত্ব যদি প্রযোজকের হাতে থাকে, তবে ডিজিটাল আয়ের পুরোটা তার কাছেই যায়। অনেক শিল্পী জানতেই পারেন না, তাদের গান থেকে নিয়মিত আয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব স্বত্ব ব্যবস্থাপনার নীতিমালা ও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে World Intellectual Property Organization। কিন্তু বাংলাদেশে এর বাস্তব প্রয়োগ এখনও সীমিত।

কপিরাইট সংক্রান্ত বিরোধে আদালতের অবস্থান মোটামুটি স্পষ্ট- চুক্তিই শেষ কথা। লিখিত চুক্তিতে যদি স্বত্ব হস্তান্তরের কথা থাকে, তবে পরে অজ্ঞতার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে বহু শিল্পী আদালতে গিয়েও ন্যায্যতা পান না। এটি প্রমাণ করে, চুক্তি করার সময় আইনি পরামর্শ নেওয়া কতটা জরুরি।

কপিরাইট আইনে শিল্পীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো নৈতিক অধিকার নিজের নাম ব্যবহারের অধিকার ও সৃষ্টিকে বিকৃত না করার অধিকার। 

তাত্ত্বিকভাবে এসব অধিকার হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু বাস্তবে আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিল্পীরা এসব অধিকার কার্যকর করতে পারেন না।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শিল্পীদের জন্য নিয়মিত আইনি সচেতনতা কার্যক্রম, কপিরাইট অফিসের কার্যক্রম, আধুনিক ও ডিজিটাল করা, সংগীত শিল্পীদের জন্য কার্যকর সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা সংস্থা (CMO) গঠন, শিল্পী-প্রযোজক চুক্তির ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা।

গান বিক্রি অপরাধ নয়। কিন্তু অজ্ঞতা, অসম চুক্তি ও স্বল্পমেয়াদি লাভের মোহে শিল্পীর সৃজনশীল ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে যাওয়া জাতির জন্যও ক্ষতির। গান কেবল বিনোদন নয়- এটি অধিকার, উত্তরাধিকার ও সংস্কৃতির অংশ। তাই গানের স্বত্ব ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা ও সচেতনতা নিশ্চিত করাই সময়ের দাবি।

বিকেপি/এমবি 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

আইন ও আদালত

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর